নয়াদিল্লি: মানুষ সভ্যতা তৈরি করেছে, প্রযুক্তিকে অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই উন্নতির শেষ কোথায়? এক দিন কি কোনও ভয়াবহ বিপর্যয়ে প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা ভেঙে পড়বে? নাকি ধ্বংসের পরেও মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াবে, নতুন করে তৈরি করবে তার হারানো পৃথিবী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পৃথিবীর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে 1000 বছরের কম্পিউটার সিমুলেশন চালালেন বিজ্ঞানীরা। ফল বলছে, সভ্যতার টিকে থাকা শুধু কোনও এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকানোর উপর নির্ভর করছে না। বরং সম্পদ কত দ্রুত শেষ হচ্ছে এবং বিপর্যয়ের পরে কতটা সম্পদ ও প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে, তার উপরেই বড় অংশে নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ।
গবেষণাটি করেছেন সেলিয়া ব্লাঙ্কো, জ্যাকব হ্যাক-মিসরা এবং জর্জ প্রফিতিলিওটিস। গবেষকেরা পৃথিবীকেন্দ্রিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে 10টি আলাদা পরিস্থিতি তৈরি করেন। প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য 200টি করে সিমুলেশন চালানো হয়। অর্থাৎ, বিভিন্ন সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক মডেল পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে arXiv-এ এবং এখনও peer review-এর মধ্য দিয়ে যায়নি।
কখন ভেঙে পড়ে সভ্যতা?
সিমুলেশনে একটি সভ্যতাকে তার সম্পদ শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অথবা হঠাৎ কোনও বড় বিপর্যয় আঘাত করা পর্যন্ত এগোতে দেওয়া হয়েছিল। সেই বিপর্যয় হতে পারে পরিবেশগত বিপর্যয়, প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা বা অন্য কোনও বড় ধাক্কা। তার পরে দেখা হয়েছে, সেই সভ্যতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে, নাকি অবশিষ্ট সম্পদ ও প্রযুক্তির সাহায্যে ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারছে।
এখানেই সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা—‘ডিউটি সাইকেল’। অর্থাৎ মোট সময়ের কতটা অংশ একটি সভ্যতা প্রযুক্তিগত ভাবে সক্রিয় থাকতে পারছে। 10টি পরিস্থিতিতে এই হার ছিল প্রায় 38 শতাংশ থেকে 100 শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ কোনও মডেলে সভ্যতা প্রায় পুরো সময়ই সক্রিয় থেকেছে, আবার কোনও মডেলে দীর্ঘ সময় প্রযুক্তিগত ভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
সব সভ্যতার পরিণতি এক নয়
সিমুলেশনের কয়েকটি পরিস্থিতিতে সভ্যতা এক বারও ভেঙে পড়েনি। তার মধ্যে ছিল ‘Golden Age’ এবং ‘Out of Eden’। বিপরীতে 10টির মধ্যে 7টি পরিস্থিতিতে প্রতিটি সিমুলেশনেই কোনও না কোনও সময়ে পতন ঘটেছে। আবার এমন মডেলও ছিল, যেখানে পতন মানেই শেষ নয়। ‘Ouroboros’ নামে একটি পরিস্থিতিতে সভ্যতা বার বার ধাক্কা খেয়ে ভেঙেছে এবং আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
তবু মোট সময়ের প্রায় 87 শতাংশ প্রযুক্তিগত ভাবে সক্রিয় থাকতে পেরেছে। অন্য দিকে ‘Living with the Land’ পরিস্থিতিতে এই হার ছিল মাত্র প্রায় 38 শতাংশ। অর্থাৎ বিজ্ঞানীদের মডেল অনুযায়ী সভ্যতার ইতিহাসকে শুধু ‘উত্থান থেকে পতন’—এই সরল রেখায় দেখলে ভুল হতে পারে। কোনও কোনও পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিগত উন্নতি, বিপর্যয়, পতন এবং পুনর্গঠন—এই চক্র বার বার চলতে পারে।
আসল চাবিকাঠি সম্পদ
সিমুলেশনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফল এখানেই। গবেষকেরা দেখেছেন, সভ্যতা কত দিন প্রযুক্তিগত ভাবে সক্রিয় থাকবে, তা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয় হল—সম্পদ ব্যবহারের গতি এবং বিপর্যয়ের পরে সেই সম্পদের কতটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। অর্থাৎ শুধু বড় বিপর্যয় ঠেকালেই হবে না। পৃথিবীর প্রাকৃতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পদ কী ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পদ দ্রুত ফুরিয়ে গেলে বিপর্যয় না এলেও সভ্যতা চাপের মুখে পড়তে পারে। আবার কোনও বিপর্যয়ের পর প্রয়োজনীয় সম্পদ, জ্ঞান ও পরিকাঠামো বেঁচে থাকলে পুনর্গঠনের সম্ভাবনা বাড়ে। এই কারণেই গবেষকেরা সম্পদের অপচয় কমানো, গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান সংরক্ষণ এবং বিপর্যয়ের পরে দ্রুত পুনর্গঠনের ব্যবস্থা তৈরির উপর জোর দিয়েছেন।
বিপর্যয়ের পর কী ভাবে ফিরবে মানুষ?
গবেষণায় একটি আকর্ষণীয় ধারণার কথাও বলা হয়েছে, ‘recovery kits’। অর্থাৎ এমন সংরক্ষিত তথ্যভান্ডার, যেখানে কৃষি, চিকিৎসা, শক্তি উৎপাদন, যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া থাকবে।
কোনও বড় বিপর্যয়ের পরে যদি বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ভেঙেও পড়ে, তা হলে এই সংরক্ষিত জ্ঞান নতুন প্রজন্মকে দ্রুত পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে। পৃথিবীতে এর একটি বাস্তব উদাহরণ হিসাবে গবেষকেরা Svalbard Global Seed Vault-এর কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে ভবিষ্যতের জন্য বিভিন্ন ফসলের বীজ সংরক্ষণ করা হয়।
এই গবেষণার সঙ্গে এলিয়েনের সম্পর্ক কোথায়?
শুনতে পৃথিবীর ভবিষ্যতের গল্প মনে হলেও গবেষণাটির সূত্রপাত আসলে মহাকাশের একটি পুরনো প্রশ্ন থেকে—Fermi paradox। মহাবিশ্ব এত বিশাল এবং এত পুরনো। যদি অন্য কোথাও বুদ্ধিমান, প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা থাকে, তা হলে এখনও তাদের কোনও স্পষ্ট চিহ্ন আমরা দেখতে পেলাম না কেন?
এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, উন্নত সভ্যতাগুলি খুব অল্প সময়ের জন্য প্রযুক্তিগত ভাবে সক্রিয় থাকে। তার পর তারা ধ্বংস হয়, অথবা এমন অবস্থায় চলে যায় যেখানে তাদের প্রযুক্তির চিহ্ন আর পৃথিবী থেকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এই কারণে গবেষকেরা ‘effective detectability duration’ নামে একটি ধারণাও ব্যবহার করেছেন। কোনও সভ্যতা হাজার বছর টিকে থাকলেও যদি তার প্রযুক্তিগত কার্যকলাপের সময় খুব কম হয়, তা হলে সেই সভ্যতাকে পৃথিবী থেকে শনাক্ত করার সুযোগও অনেক কমে যায়।
পৃথিবীর জন্য বার্তাটা কী?
এই গবেষণা কোনও ভবিষ্যদ্বাণী নয় যে মানবসভ্যতা আগামী 1000 বছরে ধ্বংস হবেই। বরং এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলি কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে পরীক্ষা করার একটি প্রচেষ্টা। গবেষকেরাও সতর্ক করেছেন, মডেলে প্রযুক্তির বিকাশ, সম্পদের ব্যবহার এবং মানবসমাজের আচরণ সম্পর্কে বেশ কিছু সরলীকৃত অনুমান করা হয়েছে। ফলে বাস্তব পৃথিবী যে ঠিক একই ভাবে এগোবে, এমন দাবি করা যায় না।
তবু গবেষণার বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সভ্যতার ভবিষ্যৎ শুধু বিপর্যয় এড়ানোর উপর নির্ভর করছে না। সম্পদ বাঁচানো, জ্ঞান ধরে রাখা, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে বিকেন্দ্রীভূত করা এবং বিপর্যয়ের পরে দ্রুত পুনর্গঠনের ক্ষমতা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হয়তো মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় শক্তি নিখুঁত ভাবে বিপর্যয় এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং ধাক্কা খেয়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। আর 1000 বছরের এই সিমুলেশন অন্তত সেই সম্ভাবনাটাই সামনে এনেছে।