কলকাতা: রাজনীতিতে অনেক অভিযোগই ওঠে। কিন্তু দলেরই দুই প্রবীণ ও পরিচিত নেতার মুখে যখন শোনা যায়, ‘আমার জেলে যাওয়ার জন্য দায়ী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়’, তখন তা নিছক রাজনৈতিক কটাক্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে দলের অন্দরের অস্বস্তিকেই সামনে এনে দেয়। বুধবার অনুব্রত মণ্ডলের মুখে এমন বিস্ফোরক অভিযোগ শোনা যাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। তাঁর বক্তব্যে কার্যত সিলমোহর দিয়েছেন সদ্য শিবির বদল করা কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রও। দু'জনের অভিযোগের নিশানায় একটাই নাম—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর যে অন্তর্দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত মিলছিল, বুধবারের ঘটনাপ্রবাহ তাকে আরও স্পষ্ট করে দিল। এতদিন দলের অন্দরে চাপা অসন্তোষের কথা শোনা গেলেও, এবার তা প্রকাশ্যে বিস্ফোরণের রূপ নিল।
‘কার জন্য জেলে গেলাম? অভিষেকের জন্য’
বুধবার সাংবাদিকদের সামনে অনুব্রত মণ্ডল বলেন, "আমি জেলে গেলাম কেন? কার জন্য গেলাম? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য।" গরু পাচার মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন তিহাড় জেলে ছিলেন বীরভূমের এই প্রভাবশালী নেতা। সেই কারাবাসের দায় তিনি সরাসরি চাপিয়েছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের উপর।
তবে দল ছাড়ার প্রশ্নে কেষ্টর বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর দাবি, "ঋতব্রতও তৃণমূল, আমিও তৃণমূল। আমি প্রথম দিন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলাম, এখনও তৃণমূলেই আছি।" অর্থাৎ সংগঠনের ভাঙন নয়, বরং নেতৃত্বের প্রশ্নেই তাঁর আপত্তি—এমন বার্তাই দিতে চেয়েছেন তিনি।
মদনের আরও বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘মাল না দিলে জেল’
অনুব্রতের অভিযোগের থেকেও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন মদন মিত্র। কালীঘাট শিবির ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেওয়ার পর তিনি দাবি করেন, “দলের এই পরিণতির জন্য একমাত্র অভিষেক দায়ী। ইডির থেকেও ভয়ঙ্কর এবি। হিটলারের মতো দল চালাত।”
মদনের দাবি, "যে মাল দেয়নি, তাকেই জেলে যেতে হয়েছে।" সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট করে জানান, এখানে ‘মাল’ বলতে তিনি টাকা বোঝাতে চেয়েছেন।
যদিও এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনও প্রমাণ প্রকাশ করেননি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অভিযোগগুলি অত্যন্ত গুরুতর এবং প্রমাণ ছাড়া এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে।
ইডির তলবের পরই শিবির বদল, বাড়ছে জল্পনা
মঙ্গলবার পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদন মিত্রের স্ত্রী ও দুই ছেলেকে ইডি তলব করে। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন শিবিরে যোগ দেন।
অন্যদিকে, অনুব্রত মণ্ডলও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপ থেকেই কি এই অবস্থান পরিবর্তন? যদিও অনুব্রত সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “ওসব বাজে কথা। আমি ওসবকে ভয় পাই না। ভোটে হারের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে চার বার ফোন করেছিলেন। আমি বলেছি, চোখে দেখো, না কানে দেখো?”
অভিষেক বনাম পুরনো তৃণমূল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধুই ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়। গত কয়েক বছরে তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব দ্রুত বেড়েছে। প্রার্থী নির্বাচন থেকে সাংগঠনিক রদবদল—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সময় থেকেই দলের একাংশের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে অস্বস্তির কথা বারবার সামনে এসেছে।
অনুব্রত এর আগেও অভিযোগ করেছিলেন, আইপ্যাকের সুপারিশ ও অর্থের বিনিময়ে টিকিট বণ্টনের সংস্কৃতি দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এবার সেই অভিযোগ আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্যক্তিগত কারাবাসের দায়ও অভিষেকের ঘাড়ে চাপালেন তিনি।
মমতার বার্তা: ‘অভিষেক বাঘের মতো লড়ছে’
এক দিকে যখন দলের দুই পরিচিত মুখ প্রকাশ্যে অভিষেকের বিরুদ্ধে সরব, অন্য দিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তিনি এখনও অভিষেকের পাশেই রয়েছেন।
বুধবার সমাজমাধ্যমে লাইভ বার্তায় মমতা বলেন, “অভিষেক অনেক খারাপ আপনাদের কাছে—এটাই এখন বাহানা হয়ে গিয়েছে। যদি আপনাদের চোখে ও কোনও অন্যায় করে থাকে, অভিষেকের সব অন্যায় ক্ষমা হয়ে গিয়েছে। সে আজ বাঘের মতো লড়ে যাচ্ছে।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে মমতা শুধু অভিষেকের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেননি, দলের অন্দরে তাঁর নেতৃত্ব নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
সামনে আরও বড় ভাঙনের ইঙ্গিত?
অনুব্রত মণ্ডল, মদন মিত্রের মতো দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতাদের প্রকাশ্য বিদ্রোহ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তাঁদের অভিযোগের সত্যতা এখনও স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—ভোটে পরাজয়ের পর তৃণমূলের অন্দরে নেতৃত্ব, সংগঠন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা আর চাপা নেই। কালীঘাট বনাম নবীন নেতৃত্ব, পুরনো সংগঠন বনাম নতুন কৌশল—এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে আরও তীব্র হবে কি না, সেটাই এখন বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন।