হরিদ্বার: কাঁধে কাঁওয়ার, হাতে গঙ্গাজল। ‘বোল বম’ ধ্বনিতে মুখর ছিল হরিদ্বার। কোটি কোটি পুণ্যার্থীর ভিড়ে কয়েক দিন ধরে গমগম করেছে গঙ্গার ঘাট। যাত্রা শেষ। ভক্তেরা ফিরে গিয়েছেন ঘরে। কিন্তু তাঁদের পিছনে হরিদ্বারের ঘাটে রয়ে গেল একেবারে অন্য ছবি। গঙ্গাজল নিয়ে যাওয়া সেই পুণ্যার্থীদের ভিড় সরে যেতেই হর কি পৌড়ির চেঞ্জিং রুম ও শৌচাগার চত্বরে মিলল প্রস্রাবভর্তি জলের বোতল। সঙ্গে প্লাস্টিক, পোশাক, খাবারের প্যাকেট এবং নানা ধরনের বর্জ্য। সব মিলিয়ে হরিদ্বারে প্রায় ৭ হাজার টন আবর্জনা পরিষ্কার করতে হচ্ছে বলে প্রশাসনিক হিসাব।
জলের বোতলেই প্রস্রাব, সাফ করছেন কর্মীরা
হর কি পৌড়ির যে ছবি সামনে এসেছে, তা-ই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, চেঞ্জিং রুম এবং শৌচাগারের আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ব্যবহৃত জলের বোতল ও জামাকাপড়। কয়েকটি বোতলে প্রস্রাব ভরা। সেই বোতলগুলিই একে একে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সাফাইকর্মীরা। আরও উদ্বেগের বিষয়, ভিডিয়োয় তাঁদের কারও হাতে গ্লাভস বা মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। অর্থাৎ বিপুল বর্জ্য পরিষ্কারের পাশাপাশি সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও নিতে হচ্ছে তাঁদের।
প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের ঢল
এ বার কাঁওয়ার যাত্রায় হরিদ্বারে ভিড় ছিল নজিরবিহীন। পুলিশের হিসাবে, প্রায় ৪.৮ কোটি কাঁওয়ারিয়া হরিদ্বারে এসে গঙ্গাজল সংগ্রহ করেছেন। গত বছরের প্রায় ৪.৫ কোটির সংখ্যাকেও এ বার ছাপিয়ে গিয়েছে ভিড়।
এত মানুষের কয়েক দিনের উপস্থিতির চাপ যে শহরের নিকাশি, শৌচাগার এবং বর্জ্য ব্যবস্থার উপরে পড়বে, তা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু যাত্রা শেষে যে পরিমাণ বর্জ্য সরাতে হচ্ছে, তাতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
৭ হাজার টন বর্জ্যের ভার
হরিদ্বারের বিভিন্ন ঘাট, রাস্তা এবং যাত্রাপথ থেকে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। প্লাস্টিকের বোতল ও খাবারের প্যাকেটের পাশাপাশি পড়ে রয়েছে ব্যবহৃত পোশাক, কাঁওয়ারের ভাঙা অংশ এবং অন্যান্য সামগ্রী। সব মিলিয়ে হরিদ্বারে প্রায় ৭,০০০ টন বর্জ্য জমার কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ কোটি মানুষের ধর্মীয় সমাগম শেষ হওয়ার পর এখন শহরের সামনে দ্বিতীয় লড়াই—আবর্জনার পাহাড় সরানো।
পবিত্র গঙ্গার তীরে এই ছবি কেন?
কাঁওয়ার যাত্রার সঙ্গে গঙ্গা ও শিবভক্তির গভীর সম্পর্ক। দূরদূরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা হরিদ্বারে আসেন গঙ্গাজল সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই গঙ্গার অন্যতম প্রধান ঘাট হর কি পৌড়ির আশপাশেই যদি প্রস্রাবভর্তি বোতল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে থাকে, তা হলে প্রশ্ন শুধু পরিচ্ছন্নতার নয়—প্রশ্ন ধর্মীয় পর্যটনের সঙ্গে পরিবেশ ও নাগরিক দায়িত্বের সামঞ্জস্য নিয়েও।
প্রশাসনের কাছে তাই শুধু এ বারের ৭ হাজার টন আবর্জনা সরানোই চ্যালেঞ্জ নয়। আগামী বছর আরও বেশি মানুষ এলে কী ভাবে বর্জ্য কমানো যাবে, পর্যাপ্ত শৌচাগার ও চেঞ্জিং রুম কী ভাবে রাখা হবে এবং সাফাইকর্মীদের নিরাপত্তা কী ভাবে নিশ্চিত করা হবে—সেই পরিকল্পনাও এখন জরুরি।
কয়েক কোটি মানুষ গঙ্গাজল নিয়ে ফিরেছেন। কিন্তু তাঁদের যাত্রা শেষ হওয়ার পরে হরিদ্বারের ঘাটে যে ছবি পড়ে রইল, তার কেন্দ্রে এখন প্রস্রাবভর্তি বোতল আর হাজার হাজার টন আবর্জনা। পুণ্যযাত্রার শেষে এই দৃশ্যই যেন প্রশ্ন তুলছে, গঙ্গাকে পবিত্র ভাবলে, গঙ্গার তীরটাকেও কি পবিত্র রাখার দায় নেই?