কলকাতা: ট্রেনের চাকা তখন রেলের লাইনে ছন্দ তুলছে— ঠকঠক... ঠকঠক...। জানলার বাইরে পিছিয়ে যাচ্ছে স্টেশন, শহর, মাঠ, নদী। আর কামরার ভিতরে যেন অন্য এক জগৎ। ধূপের গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ। সামনে ফুল, ফল, কলস সাজানো। পুরোহিতের কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ, সঙ্গে ঘণ্টা আর শঙ্খের ধ্বনি। যাত্রীরা কেউ চোখ বুজে প্রার্থনায়, কেউ আবার মোবাইল তুলে সেই মুহূর্ত বন্দি করতে ব্যস্ত। মুহূর্তেই সেই ভিডিও পৌঁছে যায় সমাজমাধ্যমে। আর তারপরই শুরু বিতর্কের এক নতুন যাত্রা।
"চলন্ত ট্রেনে আবার পূজা!"— অবাক নেটিজেনদের একাংশ। কেউ প্রশ্ন তুললেন, ভারতীয় রেলের কামরা কি এখন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মঞ্চ? কেউ নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে বললেন, যাত্রীবাহী ট্রেনে এমন আয়োজন কতটা নিয়মসিদ্ধ? কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি লক্ষ লক্ষ মানুষের মোবাইলে ঘুরতে শুরু করে। প্রশংসা যেমন ছিল, তেমনই সমালোচনাও কম ছিল না।
বিতর্ক যখন চরমে, তখনই সামনে আসে উত্তর রেলের ব্যাখ্যা। আর তাতেই বদলে যায় গোটা ছবিটা।
রেলের দাবি, ভাইরাল ভিডিওটি কোনও সাধারণ যাত্রীবাহী কোচের নয়। এটি ছিল আইআরসিটিসির মাধ্যমে নিয়ম মেনে বুক করা একটি প্রাইভেট স্যালুন কোচ। অর্থাৎ, যে কামরায় পূজার আয়োজন হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল। সাধারণ যাত্রীদের সেখানে প্রবেশাধিকারই ছিল না।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই স্যালুন কোচ বুক করতে তিন লক্ষ টাকারও বেশি অর্থ জমা দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটিকে নয়াদিল্লি থেকে মুম্বইগামী পশ্চিম এক্সপ্রেসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতেই সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। রেলের দাবি, ট্রেনের চলাচল, নিরাপত্তা কিংবা অন্য কোনও যাত্রীর সফরে তার কোনও প্রভাব পড়েনি।
অনেকেরই অজানা, ভারতীয় রেলের এই স্যালুন কোচ পরিষেবা নতুন নয়। একসময় রাজা-মহারাজা, ব্রিটিশ আমলারাই এই বিশেষ কামরায় সফর করতেন। এখন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা দিলেই ব্যক্তি বা সংস্থা বিশেষ উপলক্ষে এই কোচ বুক করতে পারেন। জন্মদিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা, এমনকি কর্পোরেট সফরের জন্যও এই পরিষেবা ব্যবহৃত হয়।
তবু প্রশ্ন থামেনি। সমাজমাধ্যমের একাংশের মতে, ব্যক্তিগত কোচ হলেও চলন্ত ট্রেনে ধর্মীয় আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা উচিত। আবার অন্যদের বক্তব্য, নিয়ম মেনে বুক করা ব্যক্তিগত জায়গায় অনুষ্ঠান হলে তা নিয়ে আপত্তির বিশেষ কারণ নেই।
একটি ভিডিও, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই দেশজুড়ে তৈরি করল তর্ক, কৌতূহল আর বিভ্রান্তির ঝড়। শেষ পর্যন্ত রেলের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট হয়েছে, ভাইরাল হওয়া দৃশ্যটি কোনও নিয়মভঙ্গের ঘটনা নয়, বরং নিয়ম মেনেই বুক করা একটি ব্যক্তিগত স্যালুন কোচের ভিতরে আয়োজিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
সমাজমাধ্যমের যুগে চোখে দেখা সব ছবিই যে পুরো সত্যি নয়, চলন্ত ট্রেনের এই 'পূজার আসর' যেন সেই কথাটাই আরও একবার মনে করিয়ে দিল।