কলকাতা: রাজনীতিতে দলবদল নতুন নয়। কিন্তু দলবদলের জেরে কোনও ভোটার নিজের ভোটই ফেরত চাইছেন— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন নজির কার্যত নেই। পূর্ব বর্ধমানের এক তৃণমূল কর্মীর সেই আবেদন তাই শুধু একটি চিঠি নয়, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বাংলার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীকও বটে।
"মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেই ভোট দিয়েছিলাম। যে বিধায়ক সেই ভোটে জিতেছেন, তিনি দলবদল করেছেন। তাই আমার এবং আমার স্ত্রীর দেওয়া ভোট ফেরত চাই।"— এই আবেদন জানিয়ে পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক, সংশ্লিষ্ট বিধায়ক এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি দিয়েছেন বর্ধমান উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা সন্দীপ ভট্টাচার্য। আর সেই চিঠিই নতুন করে উসকে দিয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— ভোট কি শুধুই প্রার্থীর জন্য, নাকি দলের প্রতীক ও নেতৃত্বের প্রতিও ভোটারের অঙ্গীকার? আর নির্বাচিত প্রতিনিধি মাঝপথে রাজনৈতিক আনুগত্য বদলে ফেললে সেই জনম্যান্ডেটের দায় কে নেবে?
দলবদলের ঝড়ে বদলে গিয়েছে বাংলার রাজনীতি
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে দ্রুত সমীকরণ বদলের পর্ব। নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূলের অন্দরে দেখা দেয় নজিরবিহীন ভাঙন। তৃণমূলের প্রতীকে জয়ী ৬৬ জনেরও বেশি বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরে যোগ দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি।
তার পর থেকেই শুরু হয়েছে প্রকৃত তৃণমূলকে ঘিরে সংঘাত। একদিকে 'কালীঘাট তৃণমূল', অন্যদিকে 'ঋতব্রত তৃণমূল'— দুই পক্ষই নিজেদের আসল সংগঠন বলে দাবি করছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতীক নিয়ে টানাপোড়েন যেমন চলছে, তেমনই বিধানসভার ভিতরেও দুই পক্ষের সংঘাত একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে। এই অস্থির রাজনৈতিক আবহেই সামনে এল 'ভোট ফেরতের' দাবি।
‘প্রার্থীকে নয়, মমতাকে দেখে ভোট’
পূর্ব বর্ধমানের ২৬৬ নম্বর বর্ধমান উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কর্মী সন্দীপ ভট্টাচার্যের বক্তব্য স্পষ্ট— তিনি ব্যক্তি প্রার্থীকে দেখে ভোট দেননি। তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর ভোট ছিল তৃণমূলের প্রতীক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রকাশ।
কিন্তু তাঁদের ভোটে নির্বাচিত বিধায়ক নিশীথ কুমার মাল্লিক পরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেন। সন্দীপের অভিযোগ, ভোটে জিতে বিধায়ক দলনেত্রীর সঙ্গে 'বেইমানি' করেছেন এবং কর্মীদের বিশ্বাস ভেঙেছেন। তাই তিনি প্রতীকী অর্থেই নিজের এবং স্ত্রীর দেওয়া ভোট 'ফেরত' চেয়েছেন।
তাঁর কথায়, “আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেই দল করি। তাঁকেই বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ভোটে জিতে বিধায়ক যদি অন্য শিবিরে চলে যান, তাহলে সেই ভোটের মূল্য কোথায়?”
ইতিমধ্যেই তিনি পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধায়ককে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং ডাকযোগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও পাঠানো হয়েছে আবেদনপত্র।
একটি চিঠি, নাকি হাজারো ভোটারের ক্ষোভ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সন্দীপ ভট্টাচার্যের আবেদনকে নিছক আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্ব-কেন্দ্রিক। বহু ক্ষেত্রেই ভোটাররা স্থানীয় প্রার্থীর চেয়ে দলীয় প্রতীক এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে সামনে রেখেই ভোট দেন।
সেই কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি কয়েক মাসের মধ্যেই রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেন, তাহলে ভোটারদের একাংশের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— তাঁদের দেওয়া জনম্যান্ডেট কি তবে অন্য রাজনৈতিক শক্তির হাতে চলে গেল?
এই বিতর্ক আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে বর্ধমান উত্তর কেন্দ্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও। ওই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সঞ্জয় দাস ভোট গণনা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে পুনর্গণনার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তারই মধ্যে সামনে এল 'ভোট ফেরতের' আবেদন।
আইন কী বলছে?
ভারতের সংবিধান বা নির্বাচনী আইনে কোনও ভোটার নিজের দেওয়া ভোট 'ফেরত' নেওয়ার অধিকার পান না। ভোটগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়ে ফল প্রকাশিত হওয়ার পর সেই ভোট চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
নির্বাচিত কোনও বিধায়ক দলবদল করলে বিষয়টি বিচার হয় সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতায়। তবে ভোটার সরাসরি আবেদন করে তাঁর সদস্যপদ বাতিল করাতে পারেন না। অর্থাৎ সন্দীপ ভট্টাচার্যের আবেদন আইনগতভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই।
তাহলে কি দরকার 'রাইট টু রিকল'?
এই ঘটনাই আবার নতুন করে সামনে এনেছে 'রাইট টু রিকল' বা নির্বাচিত প্রতিনিধিকে ভোটারদের উদ্যোগে প্রত্যাহারের অধিকার নিয়ে বহুদিনের বিতর্ক।
ভারতে এমন কোনও ব্যবস্থা নেই। কিন্তু যদি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরে কোনও বিধায়কের বিরুদ্ধে পুনরায় জনমত যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে দলবদলের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি যেমন বাড়বে, তেমনই মাঝপথে রাজনৈতিক আনুগত্য বদলের প্রবণতাও কমতে পারে।
তবে এর উল্টো আশঙ্কাও রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ঘনঘন আবেদন, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং বারবার উপনির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গণতন্ত্রের সামনে নতুন প্রশ্ন
সন্দীপ ভট্টাচার্যের চিঠির কোনও আইনি মূল্য না-ও থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক মূল্য যে রয়েছে, তা মানছেন অনেকেই। কারণ, এই আবেদন আসলে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— ভোটার কি শুধুই পাঁচ বছরের জন্য নিজের মতামত জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন, নাকি নির্বাচিত প্রতিনিধির রাজনৈতিক আনুগত্য বদলে গেলে তাঁরও কিছু বলার অধিকার থাকা উচিত?
আইনের বই এখনও সেই উত্তর দেয়নি। কিন্তু বর্ধমানের এক তৃণমূল কর্মীর 'ভোট ফেরতের' আবেদন বাংলার রাজনীতিতে জনম্যান্ডেট, দলবদল এবং ভোটারের অধিকার নিয়ে এক নতুন বিতর্কের দরজা খুলে দিল।