স্নিগ্ধা চৌধুরী
আষাঢ়ের প্রথম বর্ষাধারায় যখন ধরণী স্নাত হয়, তখন যেন প্রকৃতিও অপেক্ষায় থাকে এক অনন্ত মহামিলনের। নীল আকাশের বুকে মেঘের আবরণ, মন্দিরের শিখরে উড়তে থাকা পতাকা, শঙ্খের পবিত্র ধ্বনি, ঘণ্টার অনুরণন আর লক্ষ কণ্ঠে উচ্চারিত জয় জগন্নাথ। মনে হয়, এ যেন কেবল একটি উৎসব নয়; এটি স্বয়ং পরমেশ্বরের মানুষের দুয়ারে আগমনের দিব্য ক্ষণ।
রথযাত্রা কোনো ধর্মীয় আচারমাত্র নয়; এটি আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের এক চিরন্তন সাধনা। এটি সেই দিন, যেদিন জগৎপতি জগন্নাথ তাঁর অলৌকিক সিংহাসন ছেড়ে ভক্তের হৃদয়ের পথেই যাত্রা করেন। তিনি যেন ঘোষণা করেন, ‘আমার কাছে পৌঁছতে রাজদ্বার নয়, প্রয়োজন কেবল একটি নির্মল হৃদয়।’
পুরীর নীলাচলে অধিষ্ঠিত শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও দেবী সুভদ্রা কেবল তিনটি বিগ্রহ নন; তাঁরা সৃষ্টির তিনটি চিরন্তন শক্তির প্রতীক। জগন্নাথ করুণার, বলভদ্র শক্তির এবং সুভদ্রা মায়ের অসীম স্নেহের প্রতিমূর্তি। তাঁদের রথযাত্রা তাই ভক্তির, প্রেমের এবং মুক্তির মহোৎসব।
বৈষ্ণব দর্শন বলে, জগন্নাথ আসলে শ্রীকৃষ্ণের সেই অনন্ত রূপ, যেখানে তিনি কেবল বৃন্দাবনের গোপাল নন, সমগ্র বিশ্বের আশ্রয়। কুরুক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণের দিনে যখন বৃন্দাবনের গোপ-গোপীরা কৃষ্ণের সঙ্গে পুনর্মিলিত হলেন, তখন তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটাই, দ্বারকার মহারাজ নয়, তাঁরা ফিরে পেতে চান সেই বংশীবাদক, সেই নন্দলালকে, যাঁর হাসিতে ছিল বৃন্দাবনের প্রাণ।
ভক্তির সেই আকুল আর্তি শুনে কৃষ্ণ যেন অন্তরে বৃন্দাবনের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেই অন্তরযাত্রার বহিঃপ্রকাশই আজকের রথযাত্রা। তাই রথের রশি টানা কেবল কাঠের রথ টানা নয়; এটি নিজের অহংকার, লোভ, মোহ ও অন্ধকারকে টেনে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করার এক মহান সাধনা।
জগন্নাথদেবের আবির্ভাবের কাহিনিও এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা বহন করে। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন বিষ্ণুভক্ত। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন এক মন্দির নির্মাণের, যেখানে স্বয়ং পরমব্রহ্ম অধিষ্ঠান করবেন। কিন্তু পরমাত্মাকে কি মানুষের ইচ্ছায় পাওয়া যায়? না। তিনি ধরা দেন তখনই, যখন ভক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় আত্মসমর্পণ।
সমুদ্র থেকে ভেসে আসা সেই দারুব্রহ্ম যেন ঘোষণা করেছিল, ঈশ্বর কখনও মানুষের সৃষ্টি নন; বরং মানুষই তাঁর কৃপায় ঈশ্বরকে অনুভব করার সুযোগ পায়।
যিনি বিশ্বকর্মা, যিনি আবার অনন্ত মহারাণা রূপে আবির্ভূত হন, তিনি যখন বিগ্রহ নির্মাণে প্রবৃত্ত হলেন, তখন শর্ত ছিল, অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ঈশ্বরকে লাভের পথে সবচেয়ে বড় সাধনা হলো ধৈর্য।
কিন্তু মানুষের অস্থিরতা চিরন্তন। রানী গুণ্ডিচা সেই অপেক্ষা পূর্ণ করতে পারলেন না। দরজা খুলতেই দেখা গেল অসম্পূর্ণ বিগ্রহ। বাহ্যদৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ, অথচ আধ্যাত্মিক সত্যে পরিপূর্ণ।
সেই রূপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বেদান্তের এক অনন্ত দর্শন। পরমাত্মার কোনো সীমাবদ্ধ রূপ নেই। তিনি হাত ছাড়াই আশীর্বাদ করেন, চোখ ছাড়াই সকলকে দেখেন, পদ ছাড়াই সর্বত্র বিরাজ করেন। মানুষের শিল্প যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকেই শুরু হয় ঈশ্বরের অসীমতা।
জগন্নাথের বিশাল দুটি চক্ষু যেন অনন্ত করুণার প্রতীক। সেই দৃষ্টি কখনও ঘুমায় না। তিনি প্রতিটি জীবের দুঃখ, আনন্দ, কান্না ও প্রার্থনা সমানভাবে ধারণ করেন। তাঁর মুখে নেই ভাষা, অথচ তাঁর নীরবতাই যুগে যুগে লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে বাণী হয়ে ধ্বনিত হয়েছে।
রথযাত্রার দিনটি আরও একটি মহান সত্যের শিক্ষা দেয়। বছরের অধিকাংশ সময় দেবতা মন্দিরে থাকেন, কিন্তু এই একদিন তিনি নিজেই মানুষের ঘরে আসেন। তিনি ভক্তের অপেক্ষা করেন না; তিনি নিজেই ভক্তের পথে হাঁটেন। তাই এই যাত্রা করুণার যাত্রা, অনুগ্রহের যাত্রা।
রথের দড়িতে যখন লক্ষ হাত একসঙ্গে স্পর্শ করে, তখন সেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, জাতি-বর্ণ কিংবা ধর্মের কোনো ভেদরেখা থাকে না। সবাই একই দড়িতে বাঁধা, কারণ পরমেশ্বরের দৃষ্টিতে সকল আত্মাই সমান।
সাত দিন পরে বাহুদা যাত্রায় জগন্নাথ আবার নীলাচলে ফিরে আসেন। কিন্তু এই ফিরে আসা কেবল মন্দিরে নয়; তিনি ফিরে আসেন প্রতিটি ভক্তের অন্তরে। যাঁর হৃদয়ে একবার জগন্নাথের করুণা জেগে ওঠে, তাঁর জীবনের পথ আর কখনও আগের মতো থাকে না।
রথযাত্রা আমাদের শেখায়, জীবনও এক রথ। শরীর তার বাহন, মন তার সারথি, আর আত্মা সেই পথিক, যে চিরকাল পরমাত্মার সন্ধানে এগিয়ে চলেছে। সংসারের পথে যতই ঝড় আসুক, যদি বিশ্বাসের রশি কখনও হাতছাড়া না হয়, তবে একদিন সেই রথ নিশ্চিতই পৌঁছে যাবে চিরশান্তির নীলাচলে।
জগন্নাথ কেবল পুরীর দেবতা নন, তিনি অনন্ত করুণার মহাসমুদ্র। তিনি সেই প্রভু, যিনি অসম্পূর্ণ মানুষকেও আপন করে নেন, ভগ্ন হৃদয়েও আশ্রয় দেন, আর নিঃস্ব আত্মাকেও প্রেমে পূর্ণ করে তোলেন।
তাই রথযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি আত্মসমর্পণের দিন, অহংকার বিসর্জনের দিন, প্রেমের দিন, মুক্তির দিন। নীলাচলের সেই মহারথ আজও যুগে যুগে মানবজাতিকে একটাই আহ্বান জানিয়ে চলেছে-এসো, রশি নয়, তোমার হৃদয়টি আমার হাতে তুলে দাও। আমি তোমাকে তোমার নিজের মধ্যেই পরম সত্যের পথে নিয়ে যাব।