দিব্যেন্দু ঘোষ
যারা কথায় কথায় চমকাতেন, বুলি ছাড়তেন ‘মারব এখানে লাশ পড়বে শ্মশানে’, তার রাতারাতি শুধরে যান, নইলে বিপদ, ঘোর বিপদ। কারণ, রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়ে গেল বহুচর্চিত ‘গুন্ডা দমন আইন’ (Goonda Act)। নারী নির্যাতন, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতেই প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপ। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এহেন কড়া আইনের প্রয়োগ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
গুন্ডা দমন আইনের পোস্টমর্টেম
নারী নির্যাতন, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ আর মাফিয়াদের ডানা ছাঁটতেই প্রশাসনের এই ব্রহ্মাস্ত্র। কিন্তু এই আইন কি সত্যিই মুশকিল আসান, নাকি বিরোধীদের শায়েস্তা করার রাজনৈতিক তুরুপের তাস? এই আইনের খসড়া ও প্রয়োগপদ্ধতি দেখলে যে কোনও দাগি অপরাধীর কাঁপুনি ধরতে বাধ্য। প্রথমত, প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন বা আগাম আটক। প্রমাণের আগেই জননিরাপত্তার স্বার্থে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনা বিচারে জেলে ঢোকানো। দ্বিতীয়ত, তড়িপার বা এক্সটার্নমেন্ট। নিজস্ব এলাকা থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া। আর তৃতীয়ত, সিন্ডিকেটের টাকায় কেনা বেআইনি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা। সাধারণ মানুষ, যাঁরা পাড়ার ‘দাদা’দের দাপটে অতিষ্ঠ, তাঁদের কাছে বিরাট স্বস্তির। আইনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে যারা জামিন পেয়ে সাক্ষীদের ভয় দেখাত, তাদের এবার দাঁতনখ ভাঙবে। মূলত তিনটি মারাত্মক ক্লজ।
আইনের ফাঁক ও অন্ধ ক্ষমতার ফাঁদ
কিন্তু আইনের চোখে এই ক্ষমতা কতটা স্বৈরতান্ত্রিক? বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতে, সংবিধানে ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে যে মৌলিক ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে, এই আইন তার সরাসরি পরিপন্থী। সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হল ‘গুন্ডা’ শব্দের অস্পষ্ট সংজ্ঞা। পুলিশ চাইলে যে কোনও সাধারণ জমায়েত বা প্রতিবাদী মুখকেও এই তকমা দিয়ে জেলে পুরতে পারে। প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনের ক্ষেত্রে জামিনের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে, যা প্রকারান্তরে পুলিশের হাতে অন্ধ ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। মানবাধিকার এখানে বড় প্রশ্নের মুখে।
বিরোধীদের ক্লিনবোল্ড করার নয়া বাউন্সার?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের চোখে এই আইনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য ‘গেমপ্ল্যান’। শাসক দল রাজ্যে সুশাসন ও বিনিয়োগ টানার কথা বললেও, বিরোধীদের আশঙ্কা, এটি আসলে তাঁদের পঙ্গু করার ব্লু-প্রিন্ট। ভোটের ঠিক আগে বিরোধী দলের বুথ স্তরের সংগঠক বা সক্রিয় কর্মীদের গায়ে ‘গুন্ডা’ বা ‘সমাজবিরোধী’ তকমা সেঁটে ‘তড়িপার’ করে দেওয়া বা বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা হতে পারে। অতীতে টাডা, পোটা বা ইউএপিএ-এর মতো কড়া আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহারের যে দীর্ঘ ইতিহাস এ দেশে রয়েছে, তাতে এই আশঙ্কা অমূলক নয়।
গুন্ডা কি আকাশ থেকে পড়ে?
সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, এই আইন রোগের চিকিৎসার বদলে কেবল উপসর্গের চিকিৎসা করছে। সমাজে ‘গুন্ডা’ রাতারাতি তৈরি হয় না। বেকারত্ব, চরম বৈষম্য, দিশাহীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সংস্কৃতির গর্ভেই সমাজবিরোধীদের জন্ম হয়। ভোটের সময় পেশিশক্তি বাড়াতে পাড়ার বেকার যুবকদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলোই। পরে তারাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে ওঠে। রাজনীতি ও অপরাধের আঁতাত (Politico-criminal nexus) ছিন্ন না করে, শুধু কড়া আইন দিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত করা স্রেফ আইওয়াশ। পুরনো গুন্ডা সরলে নতুন গুন্ডা এসে সেই জায়গা নেবে।
পিকচার আভি বাকি হ্যায়…
আইনের অপব্যবহার রুখতে দ্রুত কিছু সংশোধনী প্রয়োজন। প্রথমত, ‘গুন্ডা’র আইনি সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করতে হবে। যেমন, নির্দিষ্ট সংখ্যক জামিন-অযোগ্য ধারায় পূর্ববর্তী চার্জশিট থাকা বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, পুলিশের সিদ্ধান্তে নজরদারির জন্য শুধুমাত্র আমলাদের নয়, হাইকোর্টের কর্মরত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ‘স্বাধীন রিভিউ বোর্ড’ গঠন করতে হবে, যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকের যৌক্তিকতা বিচার করবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক মদতে পুলিশ যদি মিথ্যে মামলায় কাউকে ফাঁসায়, তবে সংশ্লিষ্ট অফিসারের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তির সংস্থান থাকতে হবে। সমাজের সুরক্ষার জন্য শানিত তলোয়ারের প্রয়োজন ঠিকই। কিন্তু সেই তলোয়ার যেন রক্ষকের হাত ফসকে গণতন্ত্রের গলা না কাটে, তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।