নয়াদিল্লি: মাঝ আকাশে আচমকা ৩০০ ফুট নীচে নেমে গেল বিমান। যাত্রীরা ছিটকে পড়লেন কেবিনের ভিতর। আহত হলেন যাত্রী ও বিমানকর্মীরা। প্রথম বিবৃতিতে কারণ হিসাবে বলা হল ‘সংক্ষিপ্ত সময়ের টার্বুলেন্স’। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর সেই বিবৃতি সংশোধন করে ‘টার্বুলেন্স’ শব্দটিই বাদ দিল Air India। তার পরেই সামনে এল বিমানের ককপিটে ছাপা রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত নথি—যেখানে ঘটনার আশপাশের সময়ে একের পর এক প্রযুক্তিগত সতর্কবার্তার উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনাটি ৪ অগস্টের। ফুকেট থেকে দিল্লি আসছিল Air India-র AI2379। Airbus A320neo-তে ১৩৭ জন যাত্রী এবং আট জন বিমানকর্মী ছিলেন বলে Air India-র পরবর্তী বিবৃতিতে জানানো হয়। দিল্লিতে নিরাপদে অবতরণের আগে বিমানটি আচমকা প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতা হারায়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘটনায় অন্তত ১৩ জন যাত্রী এবং চার জন বিমানকর্মী আহত হন; অন্য সূত্রে মোট আহতের সংখ্যা ২৪ বলা হয়েছে।
প্রথমে ‘টার্বুলেন্স’, পাঁচ ঘণ্টা পর বদলে গেল বিবৃতি
ঘটনার দিন দুপুর ১টা ১৪ মিনিটে Air India প্রথম বিবৃতিতে জানায়, বিমানটি ক্রুজিং অবস্থায় ‘brief in-flight turbulence-related event’-এর মুখে পড়েছিল। তার ফলে সাময়িক ভাবে উচ্চতা পরিবর্তন হয়। সে সময় সংস্থার দাবি ছিল, গুরুতর কেউ আহত হননি এবং কয়েক জন যাত্রী ও বিমানকর্মীকে সতর্কতামূলক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর, সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে সংশোধিত বিবৃতিতে ‘turbulence’ শব্দটি আর রাখা হয়নি। বলা হয়, বিমানটি ক্রুজিং অবস্থায় আচমকা উচ্চতা হারিয়েছিল এবং পরে স্বাভাবিক ভাবেই দিল্লিতে অবতরণ করে। একই সঙ্গে ১৩ জন যাত্রী এবং চার জন বিমানকর্মী আহত হওয়ার কথাও জানানো হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন প্রথম বিবৃতিতে টার্বুলেন্সকে কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল? আর কেন পরে সেই শব্দ সরিয়ে দেওয়া হল?
ককপিটের নথিতে একের পর এক সতর্কবার্তা
সংবাদ সংস্থার হাতে আসা রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল ৯টা ৩২ মিনিট নাগাদ বিমানের তিনটি হাইড্রলিক সিস্টেমেই কম চাপের সতর্কবার্তা দেখা যায়। একই সময়ে দু’টি হাইড্রলিক রিজ়ার্ভারে তরল কম থাকার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
শুধু তাই নয়, ওই সময়ই অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বিমানের বাঁ ও ডান দিকের elevator control নিয়েও ত্রুটির বার্তা আসে। বিমানের নাক উপরে-নীচে ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে elevator অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
এর পরের কয়েক মিনিটেও একাধিক সতর্কবার্তা আসে। সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে ডান দিকের সামনের জরুরি দরজা এবং ৯টা ৩৫ মিনিটে পিছনের জরুরি দরজা নিয়ে সতর্কবার্তা দেখা যায়। পরে সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে প্রথম ইঞ্জিনের anti-ice ব্যবস্থায় ত্রুটির ইঙ্গিত আসে। ১০টা ৫২ মিনিটে আবার অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিমানের সব ক’টি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভাবে অকেজো হয়ে গিয়েছিল। Airbus A320neo-তে একাধিক হাইড্রলিক ব্যবস্থা রয়েছে এবং একটি ব্যবস্থা বিগড়ে গেলেও অন্যগুলি ব্যাক-আপ হিসাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে একাধিক সতর্কবার্তা দেখা দেওয়া নিঃসন্দেহে তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘স্টল’ সতর্কবার্তা, নাক নামিয়ে বিমান বাঁচালেন কো-পাইলট
ঘটনার আরও গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ উঠে এসেছে Air India-র অভ্যন্তরীণ Flight Safety রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, বিমানের ককপিটে হঠাৎ অডিয়ো এবং ECAM সতর্কবার্তা একসঙ্গে বাজতে শুরু করে। বিমান ‘stall’-এর দিকে যাচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা পেয়ে তখন বিমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রথম আধিকারিক প্রশিক্ষণ অনুযায়ী দ্রুত নাক নীচের দিকে নামান।
এর ফলে বিমান তীব্র ভাবে নীচের দিকে ঝুঁকে যায়। এক পর্যায়ে বিমানের গতি মাধ্যাকর্ষণের তুলনায় দ্রুত নীচের দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ককপিটের ভিতরের আলগা জিনিসপত্র, এমনকি পাইলটও সাময়িক ভাবে ভেসে ওঠেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। পরে বিমানের একটি সতর্কবার্তায় -1g structural limit অতিক্রমের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
ক্যাপ্টেন তখন নিজের আসনে ছিলেন না। তিনি প্রথম আধিকারিকের আসনের পিছনে দাঁড়িয়ে বিমানের air-conditioning system নিয়ে আলোচনা করছিলেন বলে অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামলানোর পর তিনি নিজের আসনে ফিরে নিয়ন্ত্রণ নেন এবং ইঞ্জিনে প্রয়োজনীয় thrust বাড়িয়ে বিমানের উচ্চতা ও গতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। সর্বোচ্চ প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানোর পর বিমানটি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পাইলটের মাদক পরীক্ষাতেও নতুন মোড়
ঘটনার তদন্তে আরও একটি গুরুতর বিষয় সামনে এসেছে। বিমান দিল্লিতে পৌঁছনোর পর দুই পাইলটের psychoactive substance screening করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় ক্যাপ্টেনের নমুনায় সন্দেহজনক ফল পাওয়া যায়। পরে দ্বিতীয়, confirmatory পরীক্ষার ফলও পজ়িটিভ হয়েছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। পরীক্ষায় marijuana-এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে বলেও খবর।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ফলকে ঘটনার সরাসরি কারণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে না। সরকারি ভাবে বিমান মন্ত্রকও চূড়ান্ত তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে। দুই পাইলটকেই আপাতত উড়ান থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
তদন্তে Airbus, ফ্রান্সও
ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে Aircraft Accident Investigation Bureau বা AAIB। বিমানের flight data, aircraft systems, maintenance records, operational records, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ফ্রান্সের বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা BEA এবং Airbus-ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
বিমানমন্ত্রী রাম মোহন নাইডুও Air India-র তৎকালীন CEO Campbell Wilson-এর সঙ্গে বৈঠক করে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। মন্ত্রীর বার্তা, বিমান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও রকম আপস বরদাস্ত করা হবে না।
ফলে AI2379-কাণ্ডে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—যাত্রীদের আতঙ্কিত করে দেওয়া সেই ৩০০ ফুটের পতন কি নিছক টার্বুলেন্সের ফল, নাকি তার আগে বিমানের একাধিক প্রযুক্তিগত সতর্কবার্তা এবং ককপিটে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির সঙ্গে এর গভীর যোগ রয়েছে? উত্তর মিলবে AAIB-র চূড়ান্ত তদন্তে। তার আগে কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।