কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে ২১ জুলাই শুধু একটি কর্মসূচি নয়, দলীয় ঐক্য, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। সেই কর্মসূচির আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। ঠিক এমন সময় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী, নাট্যকার ও তৃণমূলের অন্যতম বুদ্ধিজীবী মুখ ব্রাত্য বসু। রাজনৈতিক মহলের একাংশের জল্পনা, দীর্ঘদিন কালীঘাটের অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে পরিচিত ব্রাত্যও কি এবার নতুন রাজনৈতিক ঠিকানার সন্ধানে? একই সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে তৃণমূলের আর এক পরিচিত নেত্রী সন্ধ্যারাণী সরকারের নামও।
এই জল্পনা নতুন নয়। তবে গত কয়েক দিনে তা অনেকটাই জোরালো হয়েছে। কারণ, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলে একের পর এক নেতা, বিধায়ক, সাংসদ ও সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দলত্যাগ রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে। কেউ বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, কেউ নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের। সেই আবহেই ব্রাত্য বসুকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মমতার বার্তায় বদলে গেল রাজনৈতিক সমীকরণ
এই জল্পনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিকেলে ফেসবুক লাইভে এসে কার্যত বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল ক্ষোভ, অভিমান এবং একই সঙ্গে কঠোর রাজনৈতিক বার্তা।
তিনি বলেন, “পুলিশের চাপে, সিআইডির চাপে, আইসি-ওসিদের চাপে যাঁদের যাঁদের চলে যাওয়ার আছে, তাঁরা প্লিজ ২১ জুলাইয়ের আগেই চলে যান। যাঁরা বাঁচতে চান, তাঁরা লোটা-কম্বল নিয়ে চলে যান। আমি কাউকে আটকাব না। পরে আবার ফিরে আসতে চাইলে সেটা হবে না।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য কেবল বিরোধীদের উদ্দেশে ছিল না। বরং দলের অন্দরে যাঁরা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন অথবা তদন্তকারী সংস্থার চাপের কথা বলে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের উদ্দেশেই ছিল এই বার্তা। মমতা কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন, দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলে এখনই নিন। ২১ জুলাইয়ের পর আর ফিরে আসার রাস্তা খোলা থাকবে না।
কেন বারবার উঠে আসছে ব্রাত্য বসুর নাম?
ব্রাত্য বসু তৃণমূলের সাধারণ কোনও নেতা নন। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তিনি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন। শুধু প্রশাসক হিসেবেই নয়, দলের অন্যতম বুদ্ধিজীবী মুখ, নীতিনির্ধারণের আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও দীর্ঘদিন পরিচিত ছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দলীয় কর্মসূচিতে তুলনামূলক কম উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক আলোচনায় আগের মতো দৃশ্যমান না থাকা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে জল্পনা— সব মিলিয়ে ব্রাত্য বসুর নাম এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
যদিও ব্রাত্য বসু এখনও পর্যন্ত এই সমস্ত জল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে একটি কথাও বলেননি। তাঁর নীরবতাই রাজনৈতিক মহলের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সন্ধ্যারাণীর নামও কেন আলোচনায়?
ব্রাত্য বসুর পাশাপাশি তৃণমূল নেত্রী সন্ধ্যারাণী সরকারকেও ঘিরে শিবির বদলের জল্পনা ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, কয়েক জন নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও এই দাবির স্বপক্ষে কোনও সরকারি তথ্য নেই এবং সন্ধ্যারাণীও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
২১ জুলাইয়ের আগে দলকে বার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল শহিদ দিবসের আগে দলের অন্দরে অনিশ্চয়তা দূর করা। প্রতি বছর ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই তৃণমূল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির বার্তা দেয়। তাই ওই কর্মসূচির আগে আর কোনও দলত্যাগের ঘটনা ঘটুক, তা নেতৃত্ব চাইছে না। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন— যাঁদের থাকার ইচ্ছা নেই, তাঁরা এখনই চলে যান।
ব্রাত্য যদি যান, কতটা ধাক্কা?
রাজনৈতিক মহলের মতে, ব্রাত্য বসুর মতো একজন নেতার সম্ভাব্য প্রস্থান শুধুমাত্র একজন মন্ত্রীর দলবদল হবে না। তৃণমূলের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী পরিসরে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। ফলে তাঁর মতো একজন নেতার বিদায় দলীয় ভাবমূর্তি ও সংগঠনের উপর প্রতীকী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ২১ জুলাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির আগে এমন কোনও ঘটনা ঘটলে তার রাজনৈতিক অভিঘাতও যথেষ্ট বড় হবে।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— ব্রাত্য বসু বা সন্ধ্যারাণী সরকারের দলত্যাগের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি ঘোষণা হয়নি। ফলে তাঁদের নাম ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তা রাজনৈতিক মহলের জল্পনা ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি মাত্র। আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে, এই জল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়, নাকি ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটবে।