এক বছর আগেও যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির অন্যতম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হত, সেই দেশকে নিয়েই এবার কড়া সতর্কবার্তা দিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মৌলবাদী শক্তির উত্থান এবং উগ্রপন্থী সংগঠনগুলির সক্রিয়তা— এই তিনের জেরে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এমন এক পথে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশটিকে ‘আর এক পাকিস্তান’-এ পরিণত করতে পারে। শুধু তাই নয়, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব ভারতের পূর্ব সীমান্ত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার উপর পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ভার্চুয়াল ভাষণে জয় অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে। তাঁর দাবি, যে সব জঙ্গি ও উগ্রপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে অতীতে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছিল, তাদের অনেক সদস্য এখন আবার প্রকাশ্যে সক্রিয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রভাবও বাংলাদেশে বেড়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
জয়ের কথায়, “ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত পূর্ব সীমান্তের পরিবর্তিত পরিস্থিতি। বাংলাদেশ যদি মৌলবাদী শক্তির প্রভাবাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে তার অভিঘাত শুধু ঢাকায় নয়, কলকাতা থেকে দিল্লি— গোটা ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর পড়বে।”
তিনি আরও দাবি করেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কয়েকটি সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্যে কর্মসূচি করছে এবং চরমপন্থী মতাদর্শের প্রচারও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, বাংলাদেশের ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পালাবদল হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
জয়ের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন বারবার দাবি করেছে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন শুধু ঢাকার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ভারত, চীন, পাকিস্তান এবং পশ্চিমি দেশগুলির কৌশলগত স্বার্থের কারণেও দেশটির প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা হচ্ছে। তাই সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সজীব ওয়াজেদ জয়ের অভিযোগগুলি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে করা মন্তব্য। তাঁর উত্থাপিত অভিযোগের স্বাধীন বা নিরপেক্ষ যাচাই এখনও প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেই রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী পথ কোন দিকে মোড় নেবে, তা সময়ই বলবে। তবে জয়ের মন্তব্য নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে— রাজনৈতিক অস্থিরতার এই অধ্যায় কি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের গল্প, নাকি তা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির বৃহত্তর সমীকরণকেও বদলে দিতে চলেছে?