হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বাংলাদেশে ঢাকার আধুনিক শিল্পায়নের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৫০ ও ৬০ দশকের মাঝামাঝি নির্মাণ করা হয় তেজগাঁও সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো (Csd) বা তেজগাঁও খাদ্য গোদাম। বিশাল এলাকাজুড়ে তেজগাঁও রেল স্টেশনের পূর্বপাশে নির্মিত এই খাদ্য গোদাম জাতির ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় ঘটনা। তেজগাঁওকে আধুনিক শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলাই ছিলো মুল উদ্দেশ্য। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই গুদামটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে চলেছে। গত কয়েক দশকে ঢাকা শহরে যতো পরিবর্তন বা পরিবর্তিত হয়েছে। সেই পরিবর্তন বা পরিবর্তিত অবস্থা থেকে তেজগাঁও এখন বাণিজ্যিক বা আবাসিক এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। তারপরেও তেজগাঁও খাদ্য গোদামটি স্ব-মহিমায় ইতিহাসের অংশ হিসেবে টিকে আছে।
গোদামটির চারিদিকের রাস্তায় শত-শত মালবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে কখন ডাক পরবে গোদামের মাল লোড করে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। শত-শত ড্রাইভার, হেলপার ও গোডাউনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক কর্মচারীদের কোলাহলে সবসময়ই এলাকাটি মুখরিত থাকে। সবার মাঝে একটি ভ্রাতৃত্ব বোধ ও মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
ভিতরে রয়েছে মালামাল মজুদ রাখার জন্য অনেকগুলো সেট বা গোদাম। এখানে সুন্দর ও সুরক্ষিতভাবে রাখা হয় চাউল ও গমসহ নানা রকম ভোজ্য সামগ্রী। দৃষ্টি নন্দিত একটি দ্বিতীয় তলা ভবনও রয়েছে এখানে। সেই ভবন থেকেই প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ভিতরে গিয়ে দেখা গেলো বেওয়ারিশ শত-শত কবুতরের ঝাঁক ও কাকসহ দেশীয় প্রজাতির পাখি। যা দেখলে হৃদয় জুড়িয়ে যায়। যেসব কবুতর দেখা যায় সিলেটের হজরত শাহজালাল (রঃ) মাজারে। কবুতর ও পাখিগুলো মনের আনন্দে দল বেঁধে এ সেট থেকে ওসেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পড়ে থাকা গম চাউলসহ নানারকমের খাদ্য খাচ্ছে। এ যেনো এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
তেজগাঁও খাদ্য গোদামে দেশের অভ্যন্তরিন প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে গম ও ধান সংগ্রহ ও বিদেশ থেকে আমদানি করা চাউল এবং গমসহ বিভিন্ন ভোজ্য সামগ্রী পণ্য স্বযত্নে সংরক্ষণ করা হয়। এখান থেকে ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশের এলাকায় সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
এখান থেকে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাঝে মালামাল সরবরাহ করা হয়।
এছাড়া খোলাবাজারে সাধারণ মানুষের মাঝে খাদ্য ও পণ্য সামগ্রী যেমন চাউল, আটা, তেল ও চিনিসহ নানান রকম সামগ্রী রেশনিং এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়ে থাকে।
তেজগাঁও খাদ্য গোদাম থেকে ফেয়ার প্রাইজ কর্মসূচি, ত্রাণ বিতরণ, সরকারি বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার ও স্থানীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়গুলোর মাধ্যমে খাদ্যপণ্য ( চাল ও গম) সরবরাহ করা হয়।
ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন নির্ধারিত স্থানে ট্রাকে করে ওএমএস কার্যক্রমের চাল ও আটা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ঢাকা জেলা ও আশেপাশের অনুমোদিত ডিলারদের কোটা অনুযায়ী খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা হয়।
দুর্যোগ বা সংকটের সময়ে ও বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা বা অঞ্চলে সরকারি নির্দেশনায় ত্রাণ হিসেবে বিতরণের জন্য এখান থেকে খাদ্যশস্য পাঠানো হয়। অতএব, তেজগাঁও খাদ্য গোদামের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। দেশের যে-কোন বিপর্যয়, দুর্যোগ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও এ গোদামের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের সার্বক্ষণিক লড়াকু সৈনিক বা যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে থাকেন।
দেশ ও জাতির কল্যাণে তারা দিন-রাত পরিশ্রম করেন। তাদের কাজের জন্য কোনো সময় বা শুক্র-শনি নেই। তারা বন্ধের দিনেও কাজ করেন। তাদের জন্য অফিসের টাইম টেবিলও নেই। জরুরি পরিস্থিতিতেও তাদের কাজ করতে হয় গভীর রাত পর্যন্ত। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে গোডাউনের সরকার নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোনো বারতি অর্থও দেওয়া হয় না। এবিষয়টির দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিৎ বলে মনে করি। অতীতে এ প্রতিষ্ঠানটির অনেক দুর্নাম ছিলো। অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ ছিলো এই গোদামটির। ওজনে কম দেওয়া ও চোরা পথে মালামাল বিক্রি করাসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলো পূর্বের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। আজ গোডাউনটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন বর্তমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা নিষ্ঠা ও সততার সাথে কাজ করছেন। বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অনিয়ম ও দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছেন। তেজগাঁও খাদ্য গোদাম একটি উদাহরণ হতে পারে। এ উদাহরণ ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশের প্রতিটি খাদ্য গোদাম ও প্রতিষ্ঠানে।