নয়াদিল্লি: এক সময় ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির কথা উঠলেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকত একটাই নাম— ব্রহ্মোস। বিশ্বের দ্রুততম সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র। ফিলিপিন্সের পর আরও একাধিক দেশ ব্রহ্মোস কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে দিল্লি বুঝে গিয়েছে, আগামী দিনের যুদ্ধ কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের দাপটে জেতা যাবে না। তাই এবার ভারতের নজর আরও বড় লক্ষ্য— ড্রোন, স্মার্ট গোলাবারুদ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজার।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হতে পারে এই নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি। কারণ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র বদলে যাচ্ছে অভাবনীয় গতিতে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত— সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে, কয়েক কোটি ডলারের যুদ্ধবিমানের বদলে অনেক কম খরচে তৈরি ড্রোনই শত্রুপক্ষের ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি কিংবা গোলাবারুদের ভাণ্ডারে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানছে। যুদ্ধের এই নতুন বাস্তবতাই ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের কৌশলও বদলে দিয়েছে।
সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক নয়ডার প্রতিরক্ষা সংস্থা IG Defence। সংস্থার তৈরি 'KAL' নামে একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে।
সংস্থার দাবি, এই ড্রোন প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, টানা ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা আকাশে থাকতে সক্ষম এবং ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বা অন্য পেলোড বহন করতে পারে। প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র মিললেই বিদেশে এই ড্রোন রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুধু ড্রোন নয়, আরও বড় সুযোগ দেখছে ভারত প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্সে। ক্ষেপণাস্ত্রের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে পরিচিত গাইডেন্স সিস্টেম, সেন্সর, ফিউজ, নেভিগেশন প্রযুক্তি কিংবা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জামের চাহিদা বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। এই ক্ষেত্রেই ভারতীয় সংস্থাগুলি গবেষণা ও উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা DRDO-র সঙ্গে যৌথভাবে একাধিক বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সংখ্যাও সেই আশার কথাই বলছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি পৌঁছেছে ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায়— যা এক বছরে প্রায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সামগ্রী রফতানি হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি রাডার, আর্টিলারি সিস্টেম, গোলাবারুদ, ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি, নৌবাহিনীর সরঞ্জাম এবং বিমান ও হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশও বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।
কেন্দ্রের লক্ষ্য আরও উচ্চাভিলাষী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিরক্ষা রফতানি ৫০ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি ছোঁয়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণে শুধু ব্রহ্মোসের উপর নির্ভর না করে একাধিক উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যকে সামনে আনতে চাইছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে যে দেশ উন্নত ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, সেই দেশই নেতৃত্ব দেবে।
ব্রহ্মোস ভারতের সামরিক সক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্পের বিস্তৃত পরিসর নিয়েই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ভারত। আর সেই কারণেই ব্রহ্মোসের সাফল্যের আড়ালে নীরবে তৈরি হচ্ছে নতুন অধ্যায়— যেখানে ভারতের সবচেয়ে বড় রফতানি অস্ত্র হয়তো একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং একটি অত্যাধুনিক ড্রোন বা স্মার্ট প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি।