বোলপুর: রাত তখন প্রায় শেষ। কলকাতা থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শান্তিনিকেতনে পৌঁছেছেন উবের চালক। ভাবছিলেন, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হবে সফর। কিন্তু সেই যাত্রাই পরিণত হল বিভীষিকায়। যাত্রী সেজে ওঠা তিন যুবক আচমকাই বদলে ফেলল মুখোশ। গাড়ির চাবি চাই, টাকা চাই— আপত্তি করতেই মাথায় পরপর ছুরির কোপ! রক্তাক্ত চালককে জঙ্গলের ধারে ফেলে গাড়ি নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। বোলপুরের এই ঘটনা শুধু একটি লুট নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা ও সমাজবিরোধীদের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলে দিল।
সোমবার রাত। কলকাতার বালিগঞ্জ থেকে উবের অ্যাপে একটি গাড়ি বুক করেন তিন ব্যক্তি। গন্তব্য শান্তিনিকেতন। অন্য দিনের মতোই বুকিং গ্রহণ করেছিলেন চালক পবন রাম। সামনে যে এমন দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে, তা কল্পনাও করেননি তিনি।
রাতভর গাড়ি চালিয়ে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ শান্তিনিকেতন থানার অন্তর্গত চিপকুটির জঙ্গল এলাকায় পৌঁছন তিনি। তখনও চারদিক অন্ধকার। নির্জন রাস্তা। অভিযোগ, সেই সুযোগই নেয় তিন যাত্রী।
চালকের দাবি, আচমকাই তাঁকে গাড়ি থামাতে বলা হয়। গাড়ি থামানো মাত্রই শুরু হয় আসল খেলা। গাড়ির চাবি ও মানিব্যাগ তুলে দিতে বলা হয় তাঁকে। পবন বাধা দিতেই শুরু হয় ধস্তাধস্তি। মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে আসে ধারালো ছুরি। একবার নয়, পরপর তিন বার তাঁর মাথায় কোপ মারা হয়। এমনকি দুষ্কৃতীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল বলে দাবি আহত চালকের।
রক্তে ভেসে যায় গাড়ির ভিতর। তারপর গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে রাস্তার ধারের জঙ্গলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গাড়ি, নগদ টাকা এবং সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে চম্পট দেয় তিন দুষ্কৃতী।
রক্তাক্ত অবস্থায় কোনও রকমে পথচারীদের সাহায্য চান পবন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে তাঁর একটাই আক্ষেপ, “গাড়িটা কি আর ফিরে পাব?”
ঘটনার পর থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে ক্যাব ও উবের চালকদের মধ্যে। তাঁদের কথায়, অ্যাপে বুকিং এলেই এখন আর নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই। যাত্রী সেজে কে উঠছে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে রাতের দূরপাল্লার ট্রিপ যেন ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পর্যটন শহর শান্তিনিকেতনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখনও সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল। ফলে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে তদন্তকারীদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। শ্রীনিকেতন মোড়-সহ আশপাশের এলাকার ফুটেজ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। চালকের বয়ানও রেকর্ড করা হয়েছে।
বছরের প্রায় প্রতিটি সময়ই হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় থাকে শান্তিনিকেতনে। সেই শহরেই যাত্রী সেজে দুষ্কৃতীদের এমন দুঃসাহসিক হামলা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— শুধু পর্যটকই নন, যাঁরা তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন, সেই চালকেরাই কি এখন সবচেয়ে অসহায়? বোলপুরের এই রক্তাক্ত ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করে দিল।