চণ্ডীগড়: শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংসদের দুই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করে দিল শিরোমণি অকালি দল। মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার পাশাপাশি লোকসভা ও বিধানসভার আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশনেও সমর্থনের কথা জানাল সুখবীর সিংহ বাদলের দল। শুধু তাই নয়, ডিলিমিটেশনের পরে দেশের সব রাজ্যে লোকসভা আসন প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, তাকেও সমর্থন করেছে অকালি দল।
মোদীর সঙ্গে বাদলের বৈঠকের পরেই এই ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, দীর্ঘ সময় বিজেপির সঙ্গে জোটে থাকা অকালি দল ২০২০ সালে কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে এনডিএ ছেড়েছিল। তার পর থেকে দুই দলের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। শুক্রবারের বৈঠক সেই দূরত্ব কমানোর ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে যখন জল্পনা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দুই বিষয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের অবস্থানের সঙ্গে অকালি দলের সুর মিলে গেল।
তবে দলীয় নেতৃত্ব আপাতত এটিকে কোনও জোটের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেনি। বরং মহিলা সংরক্ষণ এবং ডিলিমিটেশন—দুই বিষয়েই দলের নিজস্ব অবস্থান থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
শনিবার চণ্ডীগড়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর অকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিংহ বাদল জানান, মহিলা সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ডিলিমিটেশনও এমন ভাবে করতে হবে, যাতে দেশের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য বজায় থাকে। কেন্দ্রের প্রস্তাব অনুযায়ী, সব রাজ্য মিলিয়ে লোকসভা আসন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনাতেও দল আপত্তি করছে না।
মহিলা সংরক্ষণে আর দেরি কেন?
মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে সংসদে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছে। ২০২৩ সালে সংসদে পাশ হয় ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। সেই আইনে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিন্তু আইন পাশ হলেও তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়নি। জনগণনা এবং তার পরে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই সংরক্ষণ কার্যকর হওয়ার বিষয়টি যুক্ত। ফলে আইন পাশ হওয়ার পরেও কবে থেকে বাস্তবে লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলা সংরক্ষণ দেখা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে।
অকালি দলের দাবি, আর অপেক্ষা করা উচিত নয়। সংসদে এবং বিধানসভায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। বাদলের বক্তব্য, শিখ গুরুদের শিক্ষা এবং ঐতিহ্যের মধ্যেও নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ফলে মহিলা সংরক্ষণের নীতির সঙ্গে অকালি দলের আদর্শগত বিরোধ নেই।
ডিলিমিটেশনেই আসল অঙ্ক
তবে রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ডিলিমিটেশন ঘিরে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা ও বিধানসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণই ডিলিমিটেশন। দীর্ঘদিনের স্থগিতাদেশের পরে এই প্রক্রিয়া ফের সক্রিয় হলে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আসনসংখ্যার অঙ্ক বদলাতে পারে। বিশেষ করে যে রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি, তাদের আসন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই জায়গাতেই দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, পরিবার পরিকল্পনা-সহ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক ভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলি আশঙ্কা করে, শুধুমাত্র বর্তমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে।
অকালি দলের অবস্থান, ডিলিমিটেশন হওয়া উচিত ন্যায্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ। কোনও রাজ্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব বা প্রতিনিধিত্ব যেন হঠাৎ করে কমে না যায়, সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
এই কারণেই সব রাজ্যে একসঙ্গে লোকসভা আসন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে অকালি দল। তাদের মতে, আসন বাড়ানো হলে জনসংখ্যার পরিবর্তনের প্রতিফলন যেমন ঘটবে, তেমনই পুরনো রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্বও তুলনামূলক ভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
মোদী-বদল বৈঠক ঘিরে জল্পনা
অকালি দলের এই সিদ্ধান্তের সময়টাই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে দেখা করেন সুখবীর সিংহ বাদল। দীর্ঘ সময় পর দুই নেতার এই সাক্ষাৎ ঘিরে পঞ্জাবের রাজনীতিতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—বিজেপি এবং অকালি দলের পুরনো সম্পর্ক কি ফের জোড়া লাগতে পারে?
এক সময় বিজেপি-অকালি জোট পঞ্জাবের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। ২০২০ সালে কেন্দ্রের কৃষি আইন নিয়ে মতবিরোধের জেরে সেই জোট ভেঙে যায়। পরবর্তী নির্বাচনে দুই দল আলাদা ভাবে লড়েছে।
এখন ২০২৭ সালের পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচন সামনে। ফলে মোদী-বদল বৈঠকের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া স্বাভাবিক। তার পরেই অকালি দলের মহিলা সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশন নিয়ে সমর্থন সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
যদিও এখনও পর্যন্ত বিজেপি বা অকালি দল—কোনও পক্ষই পুরনো জোট ফেরানোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি। ফলে আপাতত এটিকে সংসদীয় ইস্যুতে দুই দলের অবস্থানের মিল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
‘বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা নয়’
অকালি নেতৃত্বের বক্তব্য, কেন্দ্র কোনও প্রস্তাব আনলেই বিরোধিতা করা তাদের নীতি নয়। দলের সহ-সভাপতি তথা প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ নরেশ গুজরালের বক্তব্য, যে বিষয়গুলি দেশের স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হবে, সেখানে দল সমর্থন জানাবে।
এই মুহূর্তে সংসদে অকালি দলের উপস্থিতি খুবই সীমিত। ফলে সংখ্যার বিচারে তাদের ভোট হয়তো বড় কোনও পরিবর্তন ঘটানোর মতো নয়। কিন্তু পঞ্জাবের রাজনৈতিক সমীকরণে দলটির গুরুত্ব এখনও রয়েছে। বিশেষত কৃষক, শিখ এবং গ্রামীণ পঞ্জাবের একটি অংশে অকালি দলের ঐতিহাসিক প্রভাব রয়েছে।
সেই জায়গা থেকেই মোদী-বদল বৈঠক এবং তার পরের অকালি দলের সিদ্ধান্তকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সামনে একসঙ্গে দুই পরীক্ষা
এক দিকে সংসদে মহিলা সংরক্ষণ এবং ডিলিমিটেশন নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা। অন্য দিকে পঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন। ফলে অকালি দলের সামনে একই সঙ্গে জাতীয় এবং রাজ্য রাজনীতির দুই সমীকরণ।
মহিলা সংরক্ষণে সমর্থন জানিয়ে অকালি দল এক দিকে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল। অন্য দিকে ডিলিমিটেশনে ৫০ শতাংশ আসন বাড়ানোর প্রস্তাবে সায় দিয়ে বুঝিয়ে দিল, আসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে তারা সরাসরি বিরোধিতার পথে হাঁটছে না।
এখন দেখার, সংসদে এই সমর্থন কতটা সক্রিয় রূপ নেয়। আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন মোদী-বদল বৈঠকের পর অকালি-বিজেপি সম্পর্ক কি শুধুই সংসদীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ২০২৭-এর পঞ্জাব ভোটের আগে তার রাজনৈতিক প্রভাব আরও দূর পর্যন্ত গড়াবে?