নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে একের পর এক নোটিস। কিন্তু কেন সেই নোটিস, তার নির্দিষ্ট কারণই বা কী? দিল্লির বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এ প্রায় ৩৩.১৩ লক্ষ ভোটারকে নোটিস দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে নির্বাচন কমিশনকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ চিহ্নিত করার মাপকাঠি আরও স্পষ্ট করার নির্দেশ দিল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিপুল সংখ্যক নোটিস ‘প্রায় যান্ত্রিক ভাবে’ পাঠানো হচ্ছে কি না, তা কমিশনকে খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে এ দিন অঞ্জলি ভরদ্বাজ ও অমৃতা জোহরির দায়ের করা আবেদনের শুনানি হয়। মামলাকারীদের মূল প্রশ্ন, কোন ভোটারের ক্ষেত্রে কী ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, কেন তাঁকে নোটিস পাঠানো হয়েছে এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলতে কমিশন ঠিক কী বোঝাচ্ছে—এই বিষয়গুলি কি ভোটারদের স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে?
মামলাকারীদের হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। তাঁর বক্তব্য, দিল্লিতে ৩৩ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই নোটিসে এমন নির্দিষ্ট তথ্য নেই, যার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ভোটার বুঝতে পারবেন তাঁর ক্ষেত্রে ঠিক কী অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক নোটিসের পদ্ধতি নিয়েই আদালতের কাছে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সেই বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ, নোটিসগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ‘প্রায় যান্ত্রিক ভাবে’ পাঠানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। নোটিস তৈরিতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বা সফটওয়্যার ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও আদালতে উঠে আসে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তও কমিশনকে বলেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ ঠিক কোন ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তা আরও পরিষ্কার করে জানাতে হবে।
দিল্লির SIR-এ মোট ৩৩,১২,৯১৯ জন ভোটারের ক্ষেত্রে আলাদা করে যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৩,৭৯,৭৮৫ জনের পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে ‘ম্যাপিং’ পাওয়া যায়নি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও ১৯,৩৩,১৩৪ জনকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বিভাগের আওতায় রাখা হয়েছে। ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলতে পুরনো ও বর্তমান ভোটার তালিকার তথ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতিকে বোঝানো হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের আরও একটি জায়গা হল—আগেই দিল্লির খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৪৭.৫৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন করে ৩৩ লক্ষের বেশি ভোটারকে নোটিস দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলেছেন মামলাকারীরা। তাঁদের দাবি, নোটিস পাওয়া ভোটারদের নাম, তাঁদের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট কারণে নোটিস জারি হয়েছে এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র মাপকাঠি কী—সবই প্রকাশ করা প্রয়োজন।
শুনানিতে ভোটারদের নথি যাচাই নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য, যাঁরা ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় ফর্ম জমা দিয়েছেন এবং বয়স ও বসবাসের প্রমাণ দিয়েছেন, তাঁদের ফের একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়তে হচ্ছে কেন? তবে আদালত দিল্লির বিশেষ জনসংখ্যাগত পরিস্থিতির কথাও বিবেচনায় রাখে। রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী মানুষের বসবাসের কারণে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু আলাদা সমস্যা থাকতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
অন্য এক মামলাকারীর পক্ষে সওয়াল করেন কপিল সিব্বল। দিল্লির বহুতল আবাসনগুলিতে বুথ লেভেল অফিসার বা BLO-রা প্রত্যেক ভোটারের কাছে বাস্তবে পৌঁছতে পারছেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গের SIR-এর প্রসঙ্গও আসে।
অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশনের তরফে আদালতকে জানানো হয়, ভোটারদের সাহায্যের জন্য বিভিন্ন জায়গায় শিবির ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চলছে। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, নোটিস পাওয়া মানেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে যাওয়া নয়। যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারের বক্তব্য শোনার পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আদালত অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, এত বড় সংখ্যায় নোটিস পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি যেন ভোটারদের কাছে অস্বচ্ছ না হয়। সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে আরও সক্রিয় ভাবে সচেতনতা তৈরির পরামর্শ দিয়েছে বেঞ্চ। পাশাপাশি BLO-দের ওয়ার্ড অফিসে উপস্থিত থেকে ভোটারদের প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির SIR-এর দাবি-আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা। এরপর যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ করে ৪ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। তার আগে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ কী, কোন যুক্তিতে তা নির্ধারিত হচ্ছে এবং নোটিস পাওয়া ভোটারদের জন্য প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ—সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশন কী ব্যাখ্যা দেয়, এখন নজর সেদিকেই।