কলকাতা: শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করার বার্তা আগেই দিয়েছিল বিজেপি। এ বার সেই বার্তাই দলের অন্দরে আরও স্পষ্ট করে দেওয়া হল। কলেজের পরিচালন সমিতির নবনিযুক্ত সভাপতিদের ডেকে মঙ্গলবার জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রেক্ষাগৃহে সাংগঠনিক বৈঠক করল বিজেপির রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এক দিকে কলেজে দলবাজি না করার কড়া বার্তা দিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, অন্য দিকে পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসাবে কে কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন, কোন আইনি সীমারেখা মেনে চলতে হবে, তা বুঝিয়ে দিলেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।
রাজ্য জুড়ে সরকারপোষিত কলেজগুলির পরিচালন সমিতির সভাপতিদের নিয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। অগস্টে ২৪৭টি কলেজের সভাপতির তালিকা প্রকাশের পরে দেখা গিয়েছিল, বহু ক্ষেত্রেই বিধায়ক ও সাংসদদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরে আরও ১৭১টি কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতির নাম প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকাতেও বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতা, পদাধিকারী এবং দল-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।
ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যে বিজেপি শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় এসে কলেজের পরিচালন সমিতির মাথায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বসানো হচ্ছে কেন? বিরোধীদের সেই প্রশ্নের মধ্যেই মঙ্গলবারের বৈঠক বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। বিজেপির বক্তব্য, কলেজের প্রশাসনিক কাঠামোয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকলেও তাঁদের কাজ হবে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ উন্নত করা, দলীয় রাজনীতি চালানো নয়।
জাতীয় গ্রন্থাগারের বৈঠকে ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা এ রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, রাজ্য সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তী এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। বৈঠকে কলেজ পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। মূলত শমীক কলেজগুলিতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বার্তা দেন। আর জগন্নাথ ব্যাখ্যা করেন পরিচালন সমিতির আইনি এক্তিয়ার ও দায়িত্ব।
বিজেপির মুখপাত্র তথা ভাঙড় কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি সায়ন্তন বসুর বক্তব্য, ‘‘আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরব না বলেই এই বৈঠক হয়েছে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত করা হবে। জাতীয় গ্রন্থাগারের বৈঠকে রাজ্য সভাপতি খুব স্পষ্ট ভাবে সেই কথাই পরিচালন সমিতির সভাপতিদের মনে করিয়ে দিয়েছেন।’’
বৈঠকের বার্তার কথা জানিয়েছেন হেরম্বচন্দ্র কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি রাজকমল পাঠকও। তাঁর বক্তব্য, কলেজে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি এবং পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন মূল লক্ষ্য। তাঁর কথায়, ‘‘কলেজের পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ-সহ সামগ্রিক পরিবেশের উন্নতি এবং পড়াশোনার মান বাড়ানোর উপরেই জোর দিতে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা যাতে প্রাধান্য না পায়, সে কথাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।’’
অন্য দিকে, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি প্রশাসনিক। পরিচালন সমিতির সভাপতিরা কী করতে পারবেন, কোন ক্ষেত্রে তাঁদের ক্ষমতা রয়েছে এবং কোথায় আইনি সীমারেখা রয়েছে—তা বিস্তারিত ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় বৈঠকে। কলেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন, আর্থিক নিয়ম, অডিট এবং প্রয়োজনীয় রিটার্ন জমা দেওয়ার মতো বিষয়গুলিও আলোচনায় আসে।
রাজকমল পাঠকের অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে একাধিক কলেজে নিয়ম না মেনে নিয়োগ, অডিট না করানো বা প্রয়োজনীয় রিটার্ন জমা না দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এ জমানায় সে সব চলবে না। আইন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মেনেই পরিচালন সমিতিকে চলতে হবে। সভাপতির এক্তিয়ার কতটা, কী করা যায় এবং কী করা যায় না—উচ্চশিক্ষামন্ত্রী তা বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন।’’
তবে এই বৈঠকের মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে বিজেপির পুরনো প্রতিশ্রুতি বনাম বর্তমান নিয়োগের প্রশ্নটি। ৪০০-র বেশি কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতির তালিকায় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই শিক্ষামহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিজেপির পাল্টা যুক্তি, পরিচালন সমিতির সভাপতির রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেই পারে, কিন্তু কলেজের ভিতরে দলীয় রাজনীতির বিস্তার তাঁরা চান না। মঙ্গলবারের বৈঠকে সেই বার্তাই সাংগঠনিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন দেখার, পরিচালন সমিতির নতুন সভাপতিরা বাস্তবে কতটা সেই নির্দেশ মেনে কলেজ পরিচালনা করেন।