বলরামপুর: ক্লাসে তখন পড়াশোনা চলছিল। আচমকাই বাইরে থেকে ভেসে এল বিকট শব্দ। জানলা-দরজা কাঁপিয়ে স্কুলের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল বিসর্জনের শোভাযাত্রা। আর তার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বেঞ্চে বসে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীটি অসুস্থ হয়ে লুটিয়ে পড়ল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হল ৭ বছরের বৈষ্ণবী তিওয়ারির। উত্তরপ্রদেশের বলরামপুরের এই ঘটনায় এখন প্রশ্নের মুখে বিসর্জন শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত ডিজের শব্দ এবং শব্দদূষণের বিধি মানা হয়েছিল কি না। তবে ডিজের শব্দের কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
ঘটনাটি সোমবার সকাল ১১টা নাগাদ বলরামপুরের ডিভাইন পাবলিক স্কুলে। দ্বিতীয় শ্রেণির ক্লাস চলছিল। সেই সময় স্কুলের পাশ দিয়ে একটি প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা যায়। শোভাযাত্রায় অত্যন্ত জোরে ডিজে বাজছিল বলে স্কুল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। এনডিটিভির প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, শব্দ বাড়তেই ক্লাসের একাধিক পড়ুয়ার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। বৈষ্ণবীকেও অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চেয়ার থেকে হেলে পড়ে যায় সে।
দেখুন: https://x.com/gharkekalesh/status/2102379721556418584?s=20
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রথমে চেয়ারেই হেলে পড়ে শিশুটি। পাশে থাকা এক ছাত্র তাকে নাড়াচাড়া করে। কিছুটা সময় পরে আবার বসার চেষ্টা করে সে। কিন্তু ফের মাথা টেবিলে রেখে দেয়। শেষ পর্যন্ত চেয়ার থেকে মাটিতে পড়ে যায় বৈষ্ণবী। শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছুটে এসে তাকে সামলানোর চেষ্টা করেন। পরে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের দাবি, ডিজের বিকট শব্দের মধ্যেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয় এবং পর পর তিন বার ‘হার্ট অ্যাটাক’ হয়। তৃতীয় বার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। স্কুলের শিক্ষক ইকরা খান জানিয়েছেন, বিসর্জনের শোভাযাত্রার ডিজের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে ক্লাসরুম পর্যন্ত কেঁপে উঠছিল। সেই সময়ই বৈষ্ণবী অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে তাঁর দাবি। স্কুলের কো-অর্ডিনেটর পুমি মিশ্রও জানান, খবর পেয়ে শিক্ষকরা শিশুটিকে দ্রুত নিচে নিয়ে আসেন এবং হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
স্কুল প্রশাসক আশিস উপাধ্যায়ের বক্তব্য, পুরো ঘটনাটি স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। তাঁর অভিযোগ, শোভাযাত্রায় অত্যন্ত উচ্চ শব্দে ডিজে বাজানো হচ্ছিল। ঘটনাটি সামনে আসার পর শব্দদূষণের নিয়ম এবং স্কুলের মতো সংবেদনশীল এলাকার পাশ দিয়ে উচ্চ শব্দে শোভাযাত্রা যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি মানা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
পুলিশ অবশ্য তড়িঘড়ি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ, শোভাযাত্রার গতিপথ এবং ডিজে ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে। ডিজের শব্দের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি যোগ ছিল কি না, অন্য কোনও শারীরিক কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে কি না—সবটাই তদন্তের পরে স্পষ্ট হবে।
ঘটনাটি ঘিরে তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু একটি শিশুর আকস্মিক মৃত্যু নয়। উৎসবের শোভাযাত্রায় শব্দের মাত্রা কতটা হওয়া উচিত, স্কুল-হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গার সামনে শব্দদূষণের নিয়ম কী ভাবে মানানো হচ্ছে এবং প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর—বলরামপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা সেই প্রশ্নগুলিই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
সকালে যে মেয়েটি স্কুলে গিয়েছিল পড়াশোনা করতে, কয়েক ঘণ্টা পর তার নিথর দেহ নিয়ে ফিরতে হল পরিবারকে। আর সেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখন উত্তর খুঁজছে পুলিশ।