দিব্যেন্দু ঘোষ
আশা আসলে কী? কেবলই মরীচিকা, নাকি বেঁচে থাকার আদিম জ্বালানি? বোকাদের সান্ত্বনা নাকি বিশ্বজয়ের হাতিয়ার? আশা আসলে অন্ধকার চিরে আলোর উড়ান। মৃত্যুপুরী থেকে মহাকাশ, মানুষের টিকে থাকার জেদের নামই ‘আশা’! ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে সৃষ্টির স্বপ্ন!
আশা হল অনন্ত সম্ভাবনার স্পন্দিত দলিল। আশাকে যদি একটি মুদ্রার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তার দুই পিঠ একেবারেই আলাদা। এক পিঠে লেখা ‘মরীচিকা’, অন্য পিঠে ‘বেঁচে থাকার আদিমতম জ্বালানি’। আন্তর্জাতিক আশা দিবসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বারবার একটি প্রশ্নই মনে জাগে। আশা কি কেবলই এক অলীক বিভ্রম? নাকি মানবসভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি?
মনোবিদ ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কলের কথা ধরা যাক। তিনি ছিলেন হলোকাস্ট সারভাইভার। তাঁর বিখ্যাত বই ‘Man’s Search for Meaning’-এ আশার আশ্চর্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে। নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে তিনি এক নির্মম সত্য তুলে ধরেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, যে বন্দিদের হৃদয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে সামান্যতম ‘আশা’ বেঁচে ছিল, তাঁরাই সেই নারকীয় যন্ত্রণার মধ্যেও টিকে থাকতে পেরেছিলেন। যাঁদের আশা ফুরিয়ে গিয়েছিল, মৃত্যু তাঁদের দ্রুত গ্রাস করে। ফ্র্যাঙ্কলের মতে, আশা বিলাসিতা বা আবেগ নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ঢাল।
আশা কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ নেই। এই আশার ওপর ভিত্তি করেই মানবজাতি মহাজাগতিক স্থাপত্য গড়েছে। সালটা ১৯৭৭। মহাশূন্যের অনন্ত অন্ধকারের দিকে ছুটে গেল নাসার মহাকাশযান ‘ভয়েজার’। তাতে রাখা ছিল একটি সোনালি রেকর্ড (Voyager Golden Record)। পৃথিবীর নানা ভাষা, মানুষের হাসি, সমুদ্রের গর্জন আর বিঠোফেন থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর, সবই বন্দি ছিল সেখানে। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে অজানা কোনও ভিনগ্রহী সভ্যতার হাতে তা একদিন পৌঁছবে। এই অসম্ভব আশাতেই মানবজাতি সেদিন মহাবিশ্বের বুকে একটি চিরকুট ছুড়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞান সেদিন যুক্তির গণ্ডি পেরিয়ে আশার হাত ধরেছিল।
আবার পৃথিবীর বুকেও মানুষ গড়ে তুলেছে এক অন্যরকম আশার স্থাপত্য। নরওয়ের হাড়কাঁপানো তুষারাবৃত দ্বীপ স্বালবার্ড। সেখানে মাটির গভীরে তৈরি হয়েছে ‘গ্লোবাল সিড ভল্ট’ বা ‘ডুমসডে ভল্ট’। পারমাণবিক যুদ্ধ বা জলবায়ু বিপর্যয়ের ফলে যদি পৃথিবীর সমস্ত ফসল ধ্বংস হয়ে যায়, তারও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে মানুষ। চরম বিপর্যয়ের পর মানবসভ্যতাকে নতুন করে শুরু করতে সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে লক্ষ লক্ষ বীজ। চরম ধ্বংসকে অবধারিত জেনেও নতুন সৃষ্টির এই প্রস্তুতি আসলে আশারই এক বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক প্রতিমূর্তি।
আশার এই শক্তি ব্যক্তিমানুষের অদম্য জেদের মধ্যেও মূর্ত হয়ে ওঠে। ভারতের অসমের যাদব পায়েং তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ব্রহ্মপুত্রের বুকে অনুর্বর, খাঁ খাঁ বালুচরে তিনি গাছ লাগাতে শুরু করেছিলেন। কেউ ভাবেনি ওই রুক্ষ জমিতে অরণ্য গড়ে উঠবে। কিন্তু এক অদম্য আশার বশবর্তী হয়ে ৪০ বছর ধরে তিনি একা লড়াই করেছেন। তৈরি করেছেন ১৩৬০ একরের বিশাল অরণ্য। আজ তা হাতি, গন্ডার আর বাঘের বাসভূমি। যাদব প্রমাণ করেছেন, আশা কেবল ভবিষ্যতের নিষ্ক্রিয় স্বপ্ন নয়। আশা হল বর্তমানের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া।
আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভারতবাসী হিসেবে আমরা কী আশা করতে পারি? বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের আশা কেবল জিডিপির পরিসংখ্যানে আটকে থাকতে পারে না। আমরা এমন এক ভারতের আশা করি, যেখানে ‘চন্দ্রযান’ বা ‘গগনযান’-এর মতো মহাকাশ বিজয়ের পাশাপাশি দেশের শেষ প্রান্তের মানুষটির মুখেও অন্ন জুটবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে মুছে যাবে কাঠামোগত দারিদ্র্য। জাতি ও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সমাজ হয়ে উঠবে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ও সহনশীল।
আমরা তীব্রভাবে আশা করি এক নির্ভীক সমাজের। রাতের রাস্তায় বা কর্মক্ষেত্রে কোনও নারীকে আর ভয়ের প্রহর গুনতে হবে না। নারীর ক্ষমতায়ন কেবল স্লোগানে আটকে থাকবে না, তা সমাজের কাঠামোয় প্রতিফলিত হবে। আমরা আশা করি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার, যা কেবল কেরানি নয়, প্রকৃত মানুষ গড়বে। বেকারত্বের অবসান ঘটবে এবং তরুণ প্রজন্মের মেধা ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হবে। পরিবেশ ধ্বংস করে কর্পোরেট নগরায়ন হবে না। সর্বোপরি, আমরা আশা করি এক সুস্থ ও আপসহীন গণতন্ত্রের। যেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না এবং বাক্স্বাধীনতা কখনও ভয়ের কারণ হবে না।
আন্তর্জাতিক আশা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আশা মানুষকে হয়ত কখনও প্রতারিত করে। কিন্তু আশা ছাড়া মানুষ এক মুহূর্তও এগোতে পারে না। গীতার ‘নিষ্কাম কর্ম’র দর্শন আমাদের শেখায়, ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে কাজ করে যাওয়াই প্রকৃত মুক্তির পথ। ভয়েজার স্পেসক্রাফট হয়ত কোনওদিন কোনও ভিনগ্রহীর হাতে পৌঁছবে না, ডুমসডে ভল্টের বীজ হয়ত কোনওদিন কাজে লাগবে না, কিন্তু এই আশাগুলোই আমাদের মানুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। আমাদের স্বপ্নগুলো কোনও আকাশকুসুম কল্পনা নয়, এগুলো আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা।
আশা নিছক সান্ত্বনা বা মরীচিকা নয়। নিশ্চিত অন্ধকারকে অস্বীকার করে ক্রমাগত আলোর দিকে হেঁটে যাওয়ার যে অনন্ত যাত্রা মানুষ শুরু করেছিল, আশাই হল তার ধ্রুবতারা। আর সেই ধ্রুবতারাকে পাথেয় করেই এক নতুন, আত্মনির্ভর ও মানবিক ভারতের স্বপ্ন বুনে চলেছি আমরা।