নয়াদিল্লি: স্বাধীনতা কোনও সীমাহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার নাম নয়। রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম এবং কর্তব্যবোধ ছাড়া স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ পূর্ণতা পায় না। আজকের প্রজন্মের একাংশ স্বাধীনতাকে অনেক সময় "যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার" বলে মনে করছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বলে মন্তব্য করলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভাল। একই সঙ্গে তরুণদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ভারতের স্বাধীনতা অনায়াসে অর্জিত হয়নি; লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মবলিদান, সংগ্রাম এবং ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে। সেই ইতিহাস ভুলে গেলে স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যও হারিয়ে যাবে।
মহারাষ্ট্রের পুনেতে শনিবার লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বাধীনতার ধারণা, জাতীয় দায়িত্ববোধ এবং তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন ডোভাল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।
ডোভালের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে স্বাধীনতা এবং দায়িত্বের সম্পর্ক। তাঁর কথায়, স্বাধীনতা মানে কখনওই লাগামছাড়া জীবনযাপন বা ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বও। সেই ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রকৃত স্বাধীনতার পরিচয়।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন বিশ্বমঞ্চে ভারতের সামনে অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে কূটনীতি— একাধিক ক্ষেত্রে ভারত দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের যুবসমাজ যদি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সাফল্যের পিছনে না ছুটে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে আগামী কয়েক দশক ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠতে পারে।
এনএসএ-র কথায়, “স্বাধীনতাকে অনেকেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার বলে মনে করেন। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তার চেয়ে অনেক গভীর। স্বাধীনতা আসে দায়িত্বের সঙ্গে, আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এবং দেশের প্রতি কর্তব্যবোধের সঙ্গে।”
লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের আদর্শের প্রসঙ্গ টেনে ডোভাল বলেন, স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক চেতনা। সেই চেতনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন ব্যক্তি নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবেন।
তিনি মনে করিয়ে দেন, ভারতের স্বাধীনতা কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দুই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগ, কারাবরণ এবং জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা এসেছে। সেই ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানেই স্বাধীনতার মূল্য উপলব্ধি করা।
ডোভালের মতে, বর্তমানে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময় ভারত এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই এই সময়কে তিনি ভারতের জন্য "ঐতিহাসিক সুযোগের জানালা" বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, দেশের যুবসমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, স্বাধীনতা, দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় কর্তব্য নিয়ে ডোভালের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে রাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টার মুখে এই বার্তা শুধু নৈতিক শিক্ষার আহ্বান নয়, বরং আগামী দিনের ভারত গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে এক স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। স্বাধীনতা যে অধিকার এবং দায়িত্ব— দুইয়ের সমন্বয়, সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন অজিত ডোভাল।