ভুবনেশ্বর: ভারতে পা রাখার মাত্র পাঁচ দিন। ওড়িশা ঘুরতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন আমেরিকার চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইক। ১৫ মিনিট অন্তর বমি, হাসপাতালে স্যালাইন, বমি বন্ধের ওষুধ, দু’টি ইঞ্জেকশন—তার পরেই চমক! এক পয়সাও নিল না সরকারি হাসপাতাল। সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো করে মাইকের মন্তব্য, ‘এটাই ভারতে আমার সবচেয়ে বড় বিস্ময়।’
ভারতে এসেছেন মাত্র পাঁচ দিন। ঘুরছেন ওড়িশার নানা প্রান্তে। স্থানীয় খাবার মুখে দিয়েই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই খাবারের প্রেমই শেষ পর্যন্ত তাঁকে পৌঁছে দিল হাসপাতালের বিছানায়। শুরু হল বমি। এক বার, দু’বার নয়—প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর বমি! টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা এমন চলার পর আর ঝুঁকি নেননি আমেরিকার চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইক। ভর্তি হলেন ওড়িশার একটি গ্রামীণ সরকারি হাসপাতালে।
অচেনা জায়গা। দেওয়ালের লেখা ভাষাও তাঁর কাছে অচেনা। হাতে স্যালাইনের নল। দেওয়া হচ্ছে বমি বন্ধের ওষুধ, ইঞ্জেকশন। অথচ চিকিৎসা নিয়ে তাঁর অভিযোগ নেই। বরং হাসপাতালের বিছানা থেকেই ভিডিয়ো করে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন তিনি। আর হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় যে বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল, তা হল—চিকিৎসার জন্য তাঁকে কোনও টাকা দিতে হয়নি। মাইকের সেই ভিডিয়োই এখন সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। ভিডিয়োটিতে ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ মানুষ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
ঘটনার শুরু ওড়িশায়। ভারতে আসার পঞ্চম দিনে স্থানীয় খাবারের স্বাদে মজে গিয়েছিলেন মাইক। তাঁর নিজের কথাতেই, খাবার এতটাই ভাল লেগেছিল যে তিনি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছিলেন। তার পরেই শরীর খারাপ। শুরু হয় একটানা বমি।
তবে একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিতে ভোলেননি তিনি। এটি খাদ্যে বিষক্রিয়া নয়, জানিয়েছেন মাইক। তাঁর বক্তব্য, ভাল খাবার দেখে অতিরিক্ত খাওয়াই বিপত্তির কারণ। নিজের ভুল নিয়েও রসিকতা করেছেন তিনি। বলেছেন, খাবার এত ভাল ছিল যে ‘বোকাদের মতো’ বেশি খেয়ে ফেলেছিলেন, আর তার মাশুলও দিতে হয়েছে।
মুশকিল হল, বমি থামছিল না। প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর বমি হওয়ায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সেখানে চিকিৎসা শুরু হয়। স্যালাইন দেওয়া হয়, বমি বন্ধের ওষুধ দেওয়া হয় এবং দু’টি ইঞ্জেকশনও দেওয়া হয়। অসুস্থ অবস্থাতেও ক্যামেরার সামনে হাস্যরসের সুর বজায় রেখেছিলেন মাইক। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের শরীরে ‘এত সূচ ফোটানো’ নিয়েও মজা করেন। কিন্তু আসল চমকটি আসে সুস্থ হওয়ার পরে।
মাইক ভাবছিলেন, এই চিকিৎসার বিল কত হতে পারে? কারণ তিনি আমেরিকান। আর আমেরিকায় হাসপাতালের বিল কেমন হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জানা। তাঁর হিসাব, স্যালাইনের একটি ব্যাগ, বমি বন্ধের ওষুধ এবং দু’টি ইঞ্জেকশনের জন্যই আমেরিকায় কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারত।
কিন্তু ওড়িশার সেই সরকারি হাসপাতাল? না কয়েকশো টাকা। না কয়েক হাজার টাকা। না কোনও বিদেশি পর্যটকের জন্য আলাদা বিল। মাইকের কথায়, তাঁকে এক সেন্টও দিতে হয়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে নিজের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতাও করেছেন তিনি। মার্কিন স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপুল খরচের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর মন্তব্য, ভারতের এই ‘সমাজতান্ত্রিক’ হাসপাতাল তাঁর কাছ থেকে এক পয়সাও নেয়নি!
মাইকের এই মন্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর বিস্ময়। কারণ, একজন বিদেশি পর্যটক হিসাবে ভারতে এসে একটি প্রত্যন্ত এলাকার সরকারি হাসপাতালে এমন পরিষেবা পাওয়া তাঁর কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল।
ভিডিয়োটি প্রকাশ্যে আসার পর সমাজমাধ্যমেও নানা প্রতিক্রিয়া। কেউ লিখেছেন, ‘ফ্রি স্বাস্থ্য পরিষেবা—এমন একটা ধারণাও যে থাকতে পারে!’ কেউ আবার ওড়িশার আতিথেয়তার প্রশংসা করেছেন। কেউ মজা করে পর্যটকদের পরামর্শ দিয়েছেন, নতুন দেশে গিয়ে প্রথমেই বেশি ঝাল-মশলাদার খাবারে ঝাঁপ না দিয়ে ধীরে ধীরে স্থানীয় খাবারের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে।
তবে মাইকের অভিজ্ঞতাকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। ভারতে প্রতিটি হাসপাতালে প্রত্যেক বিদেশির সব ধরনের চিকিৎসা বিনামূল্যে হয়—এমন দাবি এই ঘটনা থেকে করা যায় না। মাইক একটি নির্দিষ্ট সরকারি হাসপাতালে একটি নির্দিষ্ট অসুস্থতার জন্য যে পরিষেবা পেয়েছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা মূলত সেটুকুই। ভারতের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজ্যভেদে, হাসপাতালভেদে এবং চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী পরিষেবা ও খরচের নিয়ম আলাদা হতে পারে।
কিন্তু তাঁর গল্পটি যে জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ, তা হল ভারত ও আমেরিকার স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচের তীব্র বৈপরীত্য। আমেরিকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা বিশ্বের অন্যতম উন্নত হলেও তার খরচও বিপুল। বিমা থাকলেও রোগীর নিজের পকেট থেকে দিতে হতে পারে বড় অঙ্কের টাকা। জরুরি বিভাগে অল্প সময়ের চিকিৎসা নিয়েও বড় বিল আসার উদাহরণ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই এক ভারতীয় প্রবাসী জানিয়েছিলেন, আমেরিকায় মাত্র দেড় ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসার জন্য তাঁর নিজের পকেট থেকে প্রায় ১,৮০০ ডলার দিতে হয়েছিল; বিমা সংস্থা আরও প্রায় ৪,০০০ ডলার দিয়েছিল।
সেই তুলনায় মাইকের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ অন্য রকম। এক দিকে আমেরিকায় কয়েক হাজার ডলারের সম্ভাব্য বিলের আতঙ্ক। অন্য দিকে ওড়িশার সরকারি হাসপাতালে স্যালাইন, ওষুধ, ইঞ্জেকশন—সব শেষে শূন্য টাকার হিসাব।
আর মাইকের গল্প একেবারে বিচ্ছিন্নও নয়। চলতি বছরেই জার্মান কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডেভিড নেবেল ভারতে এসে একটি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে জলাতঙ্কের চিকিৎসা পাওয়ার অভিজ্ঞতা সমাজমাধ্যমে জানিয়েছিলেন। গুজরাতের সুরতের সরকারি হাসপাতালে পথকুকুরের কামড়ের পরে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। চারটি ইঞ্জেকশনের প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁরও বক্তব্য ছিল, পরিষেবা দ্রুত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, অথচ তাঁকে টাকা দিতে হয়নি। অর্থাৎ, বিদেশিদের চোখে ভারতের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি অন্য ছবি ধীরে ধীরে সামনে আসছে।
ভারতীয়দের কাছে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি সাধারণ চিকিৎসাও বিপুল বিলের কারণ হতে পারে, সেই আমেরিকার এক পর্যটক যখন ভারতের প্রত্যন্ত সরকারি হাসপাতালে গিয়ে একই ধরনের চিকিৎসার শেষে ‘শূন্য’ বিল হাতে পান, তখন তাঁর বিস্ময় স্বাভাবিক।
তবে এই গল্পের আর একটি দিকও রয়েছে। মাইক যে হাসপাতালের পরিষেবা পেয়েছেন, সেটি তাঁর চোখে ‘গ্রামীণ’ এবং অচেনা। ভাষাও তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তবু চিকিৎসা ব্যবস্থা তাঁকে সেই মুহূর্তে নিরাপদ অনুভব করিয়েছে। অর্থাৎ, ভাষা, সংস্কৃতি এবং দেশের দূরত্ব পেরিয়েও জরুরি সময়ে চিকিৎসা পরিষেবাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত সফরের পঞ্চম দিনেই তাই মাইকের অভিজ্ঞতা বদলে দিল তাঁর ভ্রমণের গল্প। ওড়িশার খাবারের প্রেমে পড়ে অতিরিক্ত খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া—শুনতে যতটা মজার, তার পরের ঘটনাটি ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ। অচেনা দেশের অচেনা হাসপাতাল। শরীরে স্যালাইন। একের পর এক ওষুধ। আর শেষে হাতে এল না কোনও বিল।
আমেরিকান পর্যটকের চোখে ভারতের সেই অভিজ্ঞতাই এখন সমাজমাধ্যমে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—স্বাস্থ্য পরিষেবার আসল মূল্য কি শুধু উন্নত প্রযুক্তি আর আধুনিক হাসপাতালের চাকচিক্যে, নাকি বিপদের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতাতেও? মাইকের উত্তর অবশ্য খুব সহজ। ওড়িশার সেই হাসপাতাল তাঁকে সুস্থ করেছে। আর বিনিময়ে চায়নি এক সেন্টও।