কলকাতা: নিজেকে বারবার ‘বামপন্থী’ বলেই পরিচয় দিয়েছেন তসলিমা নাসরিন। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার অবস্থান, নারীর অধিকার নিয়ে আপসহীন লড়াই এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে স্পষ্ট মত— সব মিলিয়ে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মহলের বড় অংশের কাছেই তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন পরিচিত মুখ। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, সেই তসলিমাকেই ২০০৭ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। প্রায় দুই দশক পরে তাঁর কলকাতা প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে তাই নতুন করে উঠে আসছে প্রশ্ন— তসলিমাকে নিয়ে বামেদের অবস্থান কি বদলে গিয়েছে?
বাংলাদেশে মৌলবাদীদের ফতোয়ার মুখে ১৯৯৪ সালে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ২০০৪ সালে কলকাতায় আশ্রয় নেন তিনি। বাংলা ভাষার শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ২০০৭ সালে আত্মজীবনীর তৃতীয় খণ্ড ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েকটি মৌলবাদী সংগঠন বইটির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। কলকাতায় বিক্ষোভ, অশান্তি এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার তসলিমাকে কলকাতা থেকে সরিয়ে দেয়। সরকারি যুক্তি ছিল— তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তই বাম সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন তুলে দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, যারা হুমকি দিচ্ছিল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে একজন নির্বাসিত লেখিকাকেই কার্যত শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাবি করা একটি সরকারের কাছে এই সিদ্ধান্ত ছিল আত্মসমর্পণের সামিল— এমন অভিযোগও উঠেছিল।
তসলিমা নিজেও সেই ঘটনার কথা বারবার স্মরণ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, প্রায় সাড়ে চার মাস তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। নিজেকে বামপন্থী বলেই পরিচয় দিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, "যাদের আদর্শের প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল, তারাই কেন আমাকে রক্ষা করতে পারল না?" তাঁর ক্ষোভ ছিল, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁদের চাপে নতি স্বীকার করা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
তবে প্রায় ১৮ বছর পর ছবিটা কিছুটা বদলেছে। তসলিমার কলকাতা সফরকে ঘিরে সিপিএম নেতৃত্বের বক্তব্যে আগের তুলনায় স্পষ্টতই অন্য সুর শোনা যাচ্ছে। সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, কোনও লেখকের কণ্ঠস্বর রোধ করার অধিকার কারও নেই। অতীতে তসলিমাকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং তাঁর বই নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। অর্থাৎ, যে সিদ্ধান্ত একসময় বাম সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল, আজ সেই ঘটনাকে ঘিরে বাম নেতৃত্বের মধ্যেই আত্মসমালোচনার ইঙ্গিত মিলছে।
আগামী ১ অগস্ট রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিনের উপস্থিতি তাই শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায়েরও পুনর্মূল্যায়নের মুহূর্ত। একদিকে অতীতের সেই সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে বর্তমানের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান— এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বামফ্রন্টের তসলিমা-অধ্যায়।
প্রশ্নটা তাই আজও রয়ে গেছে— যে লেখিকা নিজেকে বামপন্থী বলে পরিচয় দিয়েছেন, তাঁকেই কি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আঘাত দিয়েছিল বাম আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতা? সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।