দিব্যেন্দু ঘোষ
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে ‘একুশে জুলাই’ মানেই ছিল কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য, যেখানে বিরোধী পরিসর ছিল কার্যত ম্লান। কিন্তু ২০২৬ সালের একুশে জুলাই নজিরবিহীন ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে। একদিকে তারামণ্ডলের সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল মঞ্চ, অন্যদিকে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে ঋতব্রতপন্থীদের সমাবেশ এবং শহিদ মিনারের নীচে কংগ্রেসের কর্মসূচি। রাজনীতির আঙিনায় এই ত্রিমুখী অবস্থান বাংলার ক্ষমতার ভারসাম্যে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। তৃণমূলের জন্মলগ্নের পর থেকে এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেনি রাজ্য রাজনীতি। এই বিভাজন কেবল স্থানের নয়, বরং বাংলার রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী মেরুকরণের চূড়ান্ত প্রতিফলন।
বিভাজনের রাজনৈতিক তাৎপর্য
এতদিন একুশে জুলাই ছিল মূলত তৃণমূলের শক্তির প্রদর্শন এবং দলনেত্রীর কন্ঠে প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি। কিন্তু এই বছরের বিভাজন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বিরোধী পরিসর এখন আর মমতার ছায়াতলে সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। ঋতব্রতপন্থীদের আলাদা মঞ্চে অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, দলের অন্দরমহলে জমতে থাকা ক্ষোভ এখন আর অন্দরমহলে নেই, তা রাজপথে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে, কংগ্রেসের অবস্থান নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই। কার্যত একঘরে, সঙ্গীসাথীহীন, একের পর এক হেভিওয়েটের মমতার হাত ছেড়ে ঋতব্রত শিবিরে চলে যাওয়ায় মমতা একেবারে একা হয়ে গেছেন। দলের জোড়াফুল প্রতীক কিংবা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস বলে দল তাঁর হাতে থাকবে কি না, সবই নির্বাচন কমিশনের কোর্টে। দলের তহবিলে নয়ছয়ের অভিযোগ, দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা বাঁধার অভিযোগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফালাফালা। সেই বিপুল তহবিল তাঁর হাতে থাকবে কি না, তাও অনিশ্চিত। আদালতে মামলা ঝুলে। এই অবস্থায় একুশে জুলাই মমতার কাছে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় মঞ্চ। দল বাঁচিয়ে রাখার বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
হিট ও ফ্লপের জটিল অঙ্ক
রাজনৈতিক মঞ্চে কে সফল হবে আর কে ব্যর্থ, তা কেবল ভিড় দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন, সংখ্যার বিচারে তারামণ্ডলের সামনের ভিড়ই হবে বৃহত্তম, কারণ তার কাছে এখনও তৃণমূল স্তরের বিশাল কর্মী বাহিনী রয়েছে। তাঁর লক্ষ্য কেবল জনসমাগম নয়, নিজের দলের কর্মীদের মনোবল ফেরানো। ‘কর্মীরাই দলের আসল সম্পদ’, এই সুর তুলে তিনি কার্যত নেতাদের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে তৃণমূল স্তরের সমর্থকদের ওপর ভরসা করার কৌশল নিয়েছেন। এটা একদিকে সাহসী, আবার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও।
অন্যদিকে, ঋতব্রতপন্থীদের ক্ষেত্রে খুব বড় ভিড় না হলেও, যদি তারা মমতা-বিরোধী একটি স্থায়ী মঞ্চ তৈরি করতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে। কংগ্রেসের জন্য এটা অস্তিত্বের সংকট কাটানোর উপায়। যদি তারা মমতা-বিরোধী ভোটের একটা নির্দিষ্ট অংশকে একত্রিত করতে পারে, তবেই তারা এই লড়াইয়ে ‘হিট’ হবে।
মমতার ‘ফিল্টারিং’ কৌশল ও ভবিষ্যৎ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যারা দল ছাড়ছে, তাদের নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। একে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভাষায় বলা যায় ‘পলিটিক্যাল ফিল্টারিং’। মমতা মনে করছেন, দলের ভেতর যারা সুবিধাবাদী, তাদের ঝরে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি এখন সম্পূর্ণ অনুগত এবং আদর্শগতভাবে নিবেদিতপ্রাণ নতুন ক্যাডার বেস তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে, এটা একটা বড় বাজি। মমতা যদি সাংগঠনিক দক্ষতা বজায় রাখতে পারেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন, তবেই তাঁর এই ফিল্টারিং সফল হবে।
মঞ্চ থেকে বার্তার অন্তর্নিহিত অর্থ
এবারের একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা হবে আগামীর ‘সিস্টেমিক’ বদলের পূর্বাভাস। তিনি সরাসরি কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুনিশ্চিত করতে চাইবেন। তার এই রণকৌশল হল, ‘কর্মীদের দ্বারা নেতার অভাবপূরণ’। এটা যেমন সাহসী, আবার অত্যন্ত স্পর্শকাতর পদক্ষেপ। এই কৌশলে ব্যর্থ হলে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত দুর্বল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
মডেলটি কি টেকসই?
প্রশ্ন উঠেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘নেতাবিহীন’ বা ‘কর্মীনির্ভর’ তৃণমূল মডেল কি দীর্ঘস্থায়ী কোনও রাজনৈতিক সমাধান? নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে মনে হয়, এটি আপাতত দলের অভ্যন্তরীণ সংকট সামলানোর একটা জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কোনও বড় রাজনৈতিক দল যখন সংকটকালে ওপরতলার নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা তৃণমূল স্তরের কর্মীদের আবেগ নিয়ে বাজি ধরে। এটা সাময়িকভাবে দলকে একজোট রাখতে পারে, কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল আবেগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশাসনিক সাফল্য এবং কাঠামোগত স্বচ্ছতা। যদি মমতা তার এই নতুন মডেলে দুর্নীতির কালি মুছতে পারেন, তবেই এটা টেকসই মডেলে রূপান্তরিত হতে পারে। অন্যথায়, এটা কেবল সাময়িক ঢাল হয়েই থাকবে।
এটা বলাই যায়, ২১ জুলাইয়ের এই ত্রিমুখী বিভাজন বাংলার রাজনীতির ‘ওল্ড গার্ড’ বনাম ‘নিও-পলিটিক্স’-এর লড়াইকে স্পষ্ট করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি এই পরিস্থিতিকে সামলে উঠতে পারেন, তবেই তিনি বাংলার মাটিতে তার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবেন। অন্যথায়, এই দিনটি তার একচ্ছত্র ক্ষমতার যুগের অবসানের সূচনালগ্ন হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হতে পারে। বাংলা কি এবার পালাবদলের এক নতুন পর্বে প্রবেশ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে একুশে জুলাইয়ের পরবর্তী ঘটনাক্রমের ওপর।