১৫ অগস্ট। স্বাধীনতার দিন। আজকের চোখে দিনটির ছবি যেন খুব পরিচিত—ত্রিবর্ণ পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, লাল কেল্লা, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। কিন্তু ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্টের ভারত ছিল একেবারেই অন্য রকম। কোথাও আনন্দ, কোথাও উন্মাদনা, কোথাও রক্তের দাগ। এক দিকে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, অন্য দিকে দেশভাগের ক্ষত। কোথাও ‘স্বাধীনতা’, কোথাও উদ্বাস্তু মানুষের হাহাকার।
আর সেই একই দিনে ইতিহাসের চার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মহম্মদ আলি জিন্না এবং কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ—ছিলেন চারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে।
নেহরু তখন দিল্লিতে। মধ্যরাত পেরিয়ে সদ্য স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদে দাঁড়িয়ে বলছেন তাঁর বিখ্যাত ‘Tryst with Destiny’ ভাষণ। ব্রিটিশ শাসনের অবসান, নতুন রাষ্ট্রের সূচনা—সেই মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলির একটি।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরেও নেহরুর রাত শেষ হয়নি। তিনি সোজা যান তৎকালীন ভাইসরয়ের প্রাসাদে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভবনে। সেখানে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে স্বাধীন ভারতের গভর্নর-জেনারেল হওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। সঙ্গে ছিল মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামের একটি খাম। স্বাধীনতার উত্তেজনায় সেই খামটি সিল করা হলেও ভিতরে নামের তালিকা ছিল কি না, তা নিয়েও ইতিহাসে মজার এক কাহিনি রয়েছে।
কিন্তু দিল্লির সেই উজ্জ্বল আলোর বাইরে তখন অন্য ভারত। গান্ধী ছিলেন উৎসবের মঞ্চ থেকে বহু দূরে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে তিনি ছিলেন বাংলার দাঙ্গাবিধ্বস্ত অঞ্চলে। সাম্প্রদায়িক হিংসায় ক্ষতবিক্ষত নোয়াখালিতে গ্রাম থেকে গ্রামে হেঁটেছেন খালি পায়ে। সঙ্গে ধর্মগ্রন্থ, মুখে শান্তির বার্তা। হিন্দু-মুসলমানকে একসঙ্গে বসিয়ে প্রার্থনা করাতে চেয়েছেন, মানুষকে শপথ করাতে চেয়েছেন—আর যেন কেউ কাউকে হত্যা না করে।
কিন্তু সেই শান্তির পথও সহজ ছিল না।
এক গ্রামে গান্ধী হিন্দু ও মুসলমানদের একসঙ্গে প্রার্থনা এবং শান্তির শপথের জন্য ডাকলেন। কেউ এল না। প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যখন কাউকে পাওয়া গেল না, তখন তাঁর চোখ পড়ল গ্রামের কয়েকটি শিশুর দিকে। একটি বল নিয়ে তাদের সঙ্গে খেলতে শুরু করলেন তিনি। বড়রা যেখানে ভয় আর অবিশ্বাসে একে অপরের কাছ থেকে দূরে, সেখানে শিশুদের মধ্যে সেই বিভাজন নেই—এই দৃশ্যকেই যেন তিনি শান্তির শিক্ষায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন। পরে গ্রামবাসীদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল, সাহস শিখতে হলে শিশুদের কাছ থেকে শিখুন। অর্থাৎ, যে দিন দিল্লি স্বাধীনতার উৎসবে মেতেছে, গান্ধীর কাছে সেই দিনটি ছিল মানুষকে বাঁচানোর দিন।
স্বাধীনতার পর দিল্লিতে ফিরে আরও একটি ঘটনায় তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিংসওয়ে হাসপাতালে তাঁর সহযোগী সুভদ্রা যোশীকে দেখতে গিয়ে তিনি দিল্লির সাম্প্রদায়িক হিংসায় কত নিরীহ মানুষ মারা গিয়েছেন জানতে চান। সংখ্যাটি হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে শুনে তিনি আরও জানতে চান—কংগ্রেসের শান্তিকর্মীদের মধ্যে কেউ কি প্রাণ হারিয়েছেন? উত্তর ছিল, না। তখনই তাঁর প্রশ্ন—যাঁরা ব্রিটিশ পুলিশের গুলি মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন, তাঁরা নিজেদের দেশের পুলিশের সামনে হিংসা ঠেকাতে পারছেন না কেন? এই জায়গাতেই ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার আনন্দের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অস্বস্তিটা স্পষ্ট হয়।
আর জিন্না? পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল ১৪ অগস্ট। যদিও ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের মূল আইনি ভাষায় ভারত ও পাকিস্তান—দুই ডোমিনিয়নের প্রতিষ্ঠার তারিখ হিসাবে ১৫ অগস্টের কথাই বলা হয়েছিল। পরে মাউন্টব্যাটেনের করাচি থেকে দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজনের কারণে পাকিস্তানের সরকারি স্বাধীনতা দিবস ১৪ অগস্ট করা হয়।
১৪ অগস্ট পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কেন্দ্রে ছিলেন জিন্না। পরের দিন, যখন ভারত তার স্বাধীনতার প্রথম সকাল দেখছে, তখনও উপমহাদেশের দুই প্রান্তে উৎসবের আবহের সঙ্গে ছিল অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ছায়া।
আর সেই ছবিতে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্যও ছিল। পাকিস্তানের স্বাধীনতার দিনটি পড়েছিল রমজানের ২৬তম দিনে। বহু মানুষ রোজা রাখছিলেন। অথচ জিন্না লর্ড মাউন্টব্যাটেনের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছিলেন। অর্থাৎ, সদ্যোজাত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার পাশে তখনও চলছিল ধর্মীয় জীবনের নিজস্ব ছন্দ।
আর একেবারে অন্য প্রান্তে ছিলেন ফয়েজ আহমদ ফয়েজ। ১৫ অগস্ট ১৯৪৭-এ তিনি ছিলেন শ্রীনগরে। স্বাধীনতার সকালকে সামনে রেখে লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সুবহ-এ-আজাদি’—‘স্বাধীনতার সকাল’। কিন্তু সেই সকালকে তিনি নিখাদ উল্লাসের সকাল হিসাবে দেখেননি। তাঁর কবিতার কেন্দ্রেই ছিল এক তীব্র প্রশ্ন—যে ভোরের অপেক্ষায় এত দিন লড়াই, সেই ভোর কি সত্যিই এসে পৌঁছেছে? কবিতাটির বহুল পরিচিত ভাবার্থ—এ আলো যেন দাগ-লাগা আলো, রাতের ক্ষত নিয়ে আসা এক ভোর; যে সকালের অপেক্ষা ছিল, এ যেন সেই সকাল নয়।
ফয়েজের সেই সংশয়কে শুধু কবির হতাশা বলে দেখলে ভুল হবে। কারণ স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই এসেছিল দেশভাগ। পঞ্জাব ও বাংলার বিভাজন, সাম্প্রদায়িক হিংসা, উদ্বাস্তু স্রোত—নতুন স্বাধীনতার আনন্দের পাশে দাঁড়িয়েছিল এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা তাই একই সঙ্গে ছিল উৎসব এবং শোকের দিন।
দিল্লিতে নেহরু ভবিষ্যতের ভারতের স্বপ্নের কথা বলছেন। গান্ধী তখন মানুষের মধ্যে শান্তি ফেরানোর জন্য লড়ছেন। জিন্না নতুন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড় করানোর কাজে ব্যস্ত। আর ফয়েজ কবিতায় ধরে রাখছেন সেই স্বাধীনতার ভোরের অন্ধকার দিকটি।
চার জনের চারটি অবস্থান যেন একই ইতিহাসের চারটি আয়না।
একটিতে রাষ্ট্রের জন্ম।
একটিতে মানুষের ক্ষত।
একটিতে নতুন দেশের দায়িত্ব।
আর একটিতে স্বাধীনতার স্বপ্ন পূর্ণ না হওয়ার আক্ষেপ।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭-এ ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশাল উপমহাদেশকে ভাগ করা, সেনা, প্রশাসন, রেল, পুলিশ, ডাকব্যবস্থা এবং সম্পদ ভাগ করার মতো বিপুল কাজ সামনে এসে পড়েছিল। সেই তাড়াহুড়োর মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল দুই দেশ। স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু সঙ্গে এসেছিল এমন এক দেশভাগ যার ক্ষত বহু প্রজন্ম পেরিয়েও ইতিহাসের শরীরে রয়ে গেছে।
তাই ১৫ অগস্ট ১৯৪৭-এর গল্প শুধুই পতাকা উত্তোলনের গল্প নয়। সেটি একসঙ্গে নেহরুর ‘স্বাধীন ভারত’, গান্ধীর ‘শান্তির ভারত’, জিন্নার ‘নতুন পাকিস্তান’ এবং ফয়েজের ‘অপূর্ণ ভোর’-এর গল্প।