নিউজ ডেস্ক: শরতের আকাশে কাশফুল দোলার সঙ্গে সঙ্গেই গন্ধ আসে পুজোর। উৎসবের সাজে সেজে ওঠে চারিদিক। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগণা জেলার দত্তপুকুর এলাকার দুর্গোৎসবের গল্প আর পাঁচটা পুজোর মতো নয়। এখানে দেবী দশভুজা নন, মাত্র দুহাতেই দশ হাতের শক্তি ধারণ করেন ‘বুড়িমা’। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই পুজোর ইতিহাস, প্রচলিত লোকবিশ্বাস এবং হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির এক অনন্য ঐতিহ্য আজও বহমান।
দত্তপুকুর থানা পেরোলেই দূর থেকে নজরে আসে মন্দিরের বিশাল চূড়া। স্থানীয়দের দাবি, আনুমানিক ১৭১০ সাল থেকে চলে আসছে এই পুজো। প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই দুর্গামূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর কেটে গিয়েছে কয়েক শতাব্দী। প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে সময়। কিন্তু বুড়িমাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসে পড়েনি ভাটা। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বংশধর শিবচন্দ্র রায়ের হাত ধরে শুরু হয় এই পুজো। এই পুজো সবার কাছে বুড়িমার বা বুড়োমার দালানের পুজো হিসেবে পরিচিত।
এখানে মায়ের রূপও বেশ আলাদা। দশটি হাতের বদলে রয়েছে মাত্র দু’টি হাত। বাকি আটটি হাত ঢাকা থাকে শাড়ির ভাঁজে। দেবীর বাহনও আলাদা। বুড়িমার বাহন দেখতে আদতে ঘোড়া মনে হলেও, পিছনের অংশ সিংহরূপী। জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় শারদোৎসবের। মহাষ্টমীর প্রায় ১৫ দিন আগে হয় বোধন।
অষ্টমীর দিন রয়েছে বিশেষ আচার। কলা, আখ ও চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয় অষ্টমীর সকালে। কৃষ্ণচন্দ্র দাসের পুকুর থেকে কয়েক হাজার মানুষ দণ্ডি কেটে মানত পূরণ করেন। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো স্মৃতি ও প্রচলিত বিশ্বাস।
তবে বুড়িমার পুজোর সবচেয়ে বড় পরিচয় হল সম্প্রীতি। কথিত আছে, প্রাচীন নিয়ম মেনে আজও কায়পুত্রপাড়ার মানুষের কাঁধে চেপেই বেদিতে অধিষ্টিত হন মা। বিসর্জনের সময়ও তাঁদের কাঁধে চেপেই দেবী পৌঁছে যান সুঁটি নদীর ঘাটে। পথে রহমত আলির বাড়ির সামনে দাঁড়ান দেবী। সেই বাড়ি প্রদিক্ষণ করে ওই পরিবারের সদস্যরা দেবীকে দর্শন করার পরেই বিসর্জনের জন্য এগিয়ে যাওয়া হয়।
দশমীর নির্দিষ্ট তিথি-নক্ষত্র মেনে পুজো শেষে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। তারপর সুঁটি নদীর দিকে রওনা দেন বুড়িমা। পুজোর রীতির মধ্যে অন্যতম, যতক্ষণ না মায়ের বিসর্জন সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ এলাকার অন্য কোনও প্রতিমার বিসর্জন হয় না।
কয়েক শতাব্দী পুরনো বুড়িমার এই পুজো শুধু একটি দুর্গোৎসব নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে মানুষের বিশ্বাস, প্রজন্মের স্মৃতি এবং ধর্মের বাইরে গিয়ে একসঙ্গে পথ চলার গল্প।
