হাওড়া, নিউজ ডেস্ক: কেউ তাকে থামাতে পারেননি। প্রতিদিন একই সময়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর সামনে লম্বা রাস্তা, দুচাকার সঙ্গী আর এক অদম্য টান। গন্তব্য একটাই। শরীরে বয়সের ভার থাকলেও সেই যাত্রায় যেন ক্লান্তির কোন চিহ্ন নেই। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অপেক্ষা করে থাকে একদল ছোট্ট মুখ। সেই মুখ গুলো দেখার জন্যই কি এতটা পথ পেরিয়ে আসা। তাঁকে দেখলে মনে হবে যেন জীবনের কোনও এক পুরনো অভ্যাস এখনও তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বয়স বাড়ছে অথচ বদলাচ্ছে না তাঁর রুটিন।
এই মানুষটির নাম বিমানচন্দ্র দুয়ারি। আমতা ১ নম্বর ব্লকের কুমারচক রূপান্তরিত নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তিনি। সূত্রে খবর, উলুবেরিয়া ১ নম্বর ব্লকের খড়িয়া ময়নাপুরে বিমানচন্দ্রের বাড়ি। তাঁর স্কুলটি বাড়ি থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে। সেই পথ প্রতিদিন সাইকেলে পাড়ি দেন তিনি। যদিও ২০১৭ সালে শিক্ষকের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। কিন্তু অবসর নেওয়ার পরেও স্কুলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি। প্রায় দশ বছর ধরে অবসরের পরেও নিয়ম করে প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে পড়ুয়াদের পড়াচ্ছেন তিনি। এমনকি এর জন্য স্কুল থেকে কোনও পারিশ্রমিকও নেন না।
তবে, শুধুমাত্র পড়ানোতেই থেমে নেই তাঁর দায়িত্ব। নিজের উদ্যোগে স্কুলে তৈরি করেছেন 'কিচেন গার্ডেন'। সময় পেলে হাতে কোদাল নিয়ে স্কুলের বাগানের মাটিতে নেমে পড়েন। স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে তিনি বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করেন। এর পাশাপাশি স্কুলে আলাদা করে গানের শিক্ষক না থাকায় তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের গানও শেখান। তাঁর উদ্যোগে স্কুলে হয়েছে খাদ্যমেলা ও বিজ্ঞান প্রদর্শনীও। এমনকি, মাঝেমধ্যে স্কুলের অনুষ্ঠানে নিজে আর্থিকভাবেও সাহায্য করেন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক পবিত্র লাঙ্গল জানান, এই স্কুলে মোট ২৮৬ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এবং স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা মোট ৯ জন। তাঁর কথায় ছাত্র শিক্ষকের সংখ্যার অনুপাতে একজন শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। এবং সেই ঘাটতি বিমান স্যার পূরণ করে দিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। অবসর নিয়েও তিনি একজন পূর্ণ সময়ের শিক্ষকের মতো স্কুলে সময় দেন।
যদিও স্কুলের সবার প্রিয় স্যারের কাছে এসব বিষয় অবশ্য কোনও 'ত্যাগ' নয়। বিমানচন্দ্রের কথায়, শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি হল তাঁর ভালোবাসা। ছোট ছোট খুদে বাচ্চাদের পড়িয়ে তিনি মানসিকভাবে তৃপ্তি পান বলে জানান। তাঁদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। বয়স হয়তো সময়ের গতিতে বেড়ে চলেছে। এবং তার পাশাপাশি শরীরও হয়তো সব সময় সাথ দেয় না। কিন্তু, প্রতিদিনের স্কুলের উদ্দেশ্যে শিক্ষকের সাইকেলের গতি এখনও থামেনি। কারণ অবসরের পর নিজেকে কথা দিয়েছিলেন যতদিন পারবেন তিনি স্কুলে আসবেন। আর হয়তো সেই অদম্য ইচ্ছা এবং প্রতিশ্রুতি আজও এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাঁকে নিয়ে যায় তাঁর প্রিয় পড়ুয়াদের কাছে।