নয়াদিল্লি: পাহাড় চুপচাপ ছিল। নদীও বয়ে যাচ্ছিল নিজের গতিতে। তার পর আচমকা হিমবাহের বরফ-শিলা ধস। নদীপথে তৈরি হল বাধা। আর সেই বাধা ভেঙে নামল জল, কাদা, পাথরের স্রোত। মুহূর্তে বদলে গেল হিমালয়ের এক বিস্তীর্ণ অংশের চেহারা। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা আবার মনে করিয়ে দিল—এই পাহাড় শুধু সৌন্দর্যের নয়, বিপদেরও। আর সেই বিপদের মধ্যেই ভারতের সামনে উঠে এল আরও বড় একটি প্রশ্ন।
প্রশ্নটি চিনের তিব্বতে তৈরি হওয়া বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে। ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর চিন যে ‘মেডগ’ মেগা-প্রকল্প তৈরি করছে, তার ক্ষমতা প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বলে জানানো হয়েছে। এই নদীই ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে ব্রহ্মপুত্র নামে বয়ে যায়। ফলে তিব্বতের পাহাড়ে তৈরি হওয়া প্রকল্পের প্রভাব শুধু চিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তার ঢেউ পৌঁছতে পারে অরুণাচল প্রদেশ হয়ে অসম এবং আরও নীচের অববাহিকায়।
তবে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে সরাসরি এই বাঁধের ফল বলা যাবে না। ২৬ অগস্টের ভয়াবহ বন্যার পিছনে মূল কারণ হিসাবে উঠে এসেছে হিমবাহ-শিলা ধস এবং তার জেরে তৈরি আকস্মিক জলস্রোত। চিনের সীমান্তবর্তী তিব্বত থেকে সেই বিপর্যয়ের অভিঘাত নেপালের নদীপথে নেমে আসে। অর্থাৎ, নেপালের বন্যা মেডগ বাঁধের ‘পরীক্ষা’ ছিল না। কিন্তু ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ের ভূপ্রকৃতিতে বড় কোনও প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট পরিবর্তন কত দ্রুত নীচের দিকে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আর সেখানেই ভারতের উদ্বেগ।
ব্রহ্মপুত্রের উজানে চিনের এত বড় প্রকল্প মানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। নদীর জলপ্রবাহ, জলধারণ, জল ছাড়ার সময় এবং তার পরিমাণ—এই সমস্ত বিষয় নিয়েই ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, হিমালয়ের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে এত বড় জলাধার ও পরিকাঠামো তৈরি করলে প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নতুন মানবসৃষ্ট ঝুঁকিও।
কারণ, এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে তৈরি এই পর্বতমালায় ভূমিকম্প, ধস, হিমবাহ ভাঙন এবং আকস্মিক বন্যা নতুন ঘটনা নয়। ১৯৫০ সালের অসম-তিব্বত ভূমিকম্পই তার ভয়াবহ উদাহরণ। সেই ভূমিকম্পের শক্তি ছিল প্রায় ৮.৭ মাত্রার।
সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, এমন একটি ভূপ্রকৃতিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হলে বিপদের হিসাব কতটা নিখুঁত ভাবে করা হয়েছে?
চিন অবশ্য বরাবরই দাবি করে এসেছে, প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচ্ছন্ন শক্তির জন্য এবং তার নকশায় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু ভারতের আশঙ্কার জায়গা অন্যত্র। নদীটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে আসে। ফলে এক দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত অন্য দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তথ্য।
উজানে কী ঘটছে, নদীর জলস্তর কত দ্রুত বাড়ছে, হিমবাহে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, বড় ধস বা GLOF—অর্থাৎ Glacial Lake Outburst Flood-এর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কি না—এই তথ্য দ্রুত নীচের দেশগুলির কাছে পৌঁছনোই হতে পারে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই দুর্বলতাটাই সামনে এনেছে। নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই চিনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আরও কার্যকর তথ্য আদানপ্রদান এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার প্রয়োজনের কথা বলে আসছে। সাম্প্রতিক বন্যার পর সেই দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
আর ভারতের ক্ষেত্রে stakes আরও বড়। ব্রহ্মপুত্র শুধু একটি নদী নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের কৃষি, জনজীবন, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির সঙ্গে এই নদী ও তার উপনদীগুলির সম্পর্ক গভীর। উজানে জলপ্রবাহের বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।
তার উপর রয়েছে আর একটি আশঙ্কা—জলকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা। ভারত ও চিনের সীমান্ত-সম্পর্ক এমনিতেই জটিল। তার উপর নদীর উৎস যদি থাকে এক দেশের নিয়ন্ত্রণে এবং সেই নদী নির্ভর করে অন্য দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ, তা হলে জলনিরাপত্তা স্বাভাবিক ভাবেই কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত অন্য। নেপালের ভয়াবহ বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ে একটি ঘটনা কী ভাবে মুহূর্তে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। বরফ, পাহাড়, নদী, বাঁধ, সেতু, সুড়ঙ্গ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—সব কিছু একই ব্যবস্থার অংশ।
একটি হিমবাহ ভাঙলেই নদী বদলে যেতে পারে। পাহাড় ধসে নদী আটকে যেতে পারে। সেই অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে নামতে পারে ‘জলের দেওয়াল’। আর তার পথে যদি থাকে শহর, গ্রাম, সেতু কিংবা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—তাহলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
নেপাল সেই ভয়াবহ ছবিই দেখেছে। আর ভারতের সামনে এখন প্রশ্ন—ব্রহ্মপুত্রের উজানে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের মেগা প্রকল্প তৈরি হওয়ার আগে, তার সম্ভাব্য বিপদের হিসাব কি যথেষ্ট স্বচ্ছ?
হিমালয়কে জয় করার প্রতিযোগিতা নয়, এখন প্রয়োজন হিমালয়কে বোঝার প্রতিযোগিতা। কারণ নদী সীমান্ত মানে না। ভূমিকম্পও নয়। হিমবাহও নয়। আর জলস্রোত এক বার পাহাড় থেকে নেমে এলে তাকে কূটনীতির টেবিলে বসিয়ে থামানো যায় না।