জমি তাঁর। দেশের মাটিও তাঁর। মাঝখানে শুধু কাঁটাতারের বেড়া। নির্দিষ্ট গেট দিয়ে সেই বেড়া পেরিয়ে নিজের জমিতে চাষ করতে যান ভারতীয় কৃষকেরা। অথচ অভিযোগ, সেই জমিতে কাজ করতে গিয়েই কখনও বাংলাদেশি দুষ্কৃতীদের হাতে অপহরণ, কখনও মারধর, কখনও আবার বাংলাদেশের পুলিশের হাতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে গ্রেফতার হতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে থাকা ভারতীয় জমিতে চাষ করাটাই এখন উত্তরবঙ্গের বহু কৃষকের কাছে আতঙ্কের হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় নতুন করে সেই আশঙ্কা সামনে এসেছে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের চাউলহাটি এলাকায়। অভিযোগ, গত ৮ অগস্ট ৩০ নম্বর গেট দিয়ে কাঁটাতারের ওপারে নিজের ছোট চা-বাগানে কীটনাশক স্প্রে করতে গিয়েছিলেন ক্ষুদ্র চা চাষি দীপঙ্কর গোপ। সেখান থেকেই কয়েক জন বাংলাদেশি তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ। পরে তাঁকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, প্রায় দেড় দিন আটকে রাখার পরে বাংলাদেশের পুলিশ তাঁকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’-এর অভিযোগে গ্রেফতার করেছে।
দীপঙ্করের পরিবার এখন উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। তাঁর বাবা মিস্ত্রিলাল গোপের অভিযোগ, ‘‘বাংলাদেশের লোকজন আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। পরে বিজিবির হাতে তুলে দেয়। ভারত সরকারের কাছে আবেদন, ছেলেকে ফিরিয়ে আনা হোক।’’ তাঁর স্ত্রী মহামায়ার কথায়, ‘‘ছোট বাচ্চা রয়েছে। স্বামীকে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’’
এক বছরেই দ্বিতীয় বড় ঘটনা
দীপঙ্করের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়—সীমান্তের কৃষকদের আশঙ্কার মূল জায়গা এখানেই। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল কোচবিহারের শীতলকুচির কৃষক উকিল বর্মনকে নিজের জমিতে চাষ করার সময় তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পরে তাঁকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের জেলে বন্দি থাকতে হয়। প্রায় ২৯ দিন পর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় দেশে ফেরেন তিনি।
দেশে ফেরার পর উকিল জানিয়েছিলেন, আর কাঁটাতারের ওপারে জমিতে চাষ করতে যেতে চান না। চার বিঘা জমির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকলেও নিরাপত্তার প্রশ্ন তাঁর কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সীমান্তের কৃষকদের ভয়, এক জনের পর এক জন যদি একই কারণে জমিতে যাওয়া বন্ধ করে দেন, তা হলে কাঁটাতারের ওপারে থাকা ভারতীয় কৃষিজমি ধীরে ধীরে অনাবাদি হয়ে পড়বে। শুধু ফসল নয়, উত্তরবঙ্গের ছোট চা-বাগানগুলিও পড়তে পারে তার প্রভাবের মুখে।
জমি ভারতের, ‘সীমান্তের ওপারে’ কেন?
উত্তরবঙ্গের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বহু জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া ভারতের আন্তর্জাতিক সীমারেখার ঠিক উপর নয়, বরং সীমান্তের ভারতীয় অংশের ভিতরে তৈরি করা হয়েছে। ফলে বেড়ার ওপারেও থেকে গিয়েছে ভারতীয় কৃষকদের জমি। সেই জমিতে যেতে হলে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের নজরদারির মধ্যে সীমান্ত বেড়া পেরোতে হয়।
এই ব্যবস্থাই কৃষকদের কাছে তৈরি করেছে অন্য রকম সমস্যা। জমি ভারতের হলেও চাষ করতে যেতে হচ্ছে কাঁটাতারের ওপারে। আর সেই যাতায়াতের সময়ই তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তার ঝুঁকি। সীমান্তের কৃষকদের অভিযোগ, বাংলাদেশের দিক থেকে এসে জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট করা, ফসল কেটে নিয়ে যাওয়া, চা পাতা চুরি কিংবা কৃষকদের হেনস্থার মতো ঘটনাও ঘটছে।
২০২৫ সালের উকিল বর্মনের ঘটনাও সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছিল। ঘটনাটি নিয়ে তৎকালীন সময়ে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে যোগাযোগ এবং বৈঠকের পর তাঁকে দেশে ফেরানো হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
২০০ ছোট চা-বাগান, উদ্বেগ ২৫ হাজার চাষিকে ঘিরে
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চিন্তা ক্ষুদ্র চা চাষিদের নিয়ে। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (CISTA)-এর দাবি, সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রায় ২০০টি ছোট চা-বাগান রয়েছে। সেখানে প্রায় ২৫ হাজার চা চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত।
সংগঠনের সভাপতি বিজয় গোপাল চক্রবর্তীর বক্তব্য, দীপঙ্কর গোপকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পর চা চাষিদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই কাঁটাতারের ওপারে নিজেদের জমিতে যেতে চাইছেন না। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে চাষিদের নিরাপত্তা এবং দীপঙ্করকে দ্রুত দেশে ফেরানোর দাবি জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনের দাবি।
চা চাষিদের বক্তব্য, নিরাপত্তার অভাবে যদি জমিতে যাওয়া বন্ধ হয়, তা হলে ক্ষতি শুধু একজন কৃষকের নয়। উৎপাদন বন্ধ হবে, জমি অনাবাদি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে এবং সীমান্তবর্তী অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে।
‘বেড়া নেই’, আবার ‘বেড়ার ওপারেও’ সমস্যা
সীমান্তের সমস্যা অবশ্য একমুখী নয়। কোথাও এখনও বেড়া না থাকার কারণে অনুপ্রবেশ ও পাচার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, আবার যেখানে বেড়া রয়েছে, সেখানে বেড়ার ওপারে থেকে যাওয়া ভারতীয় জমিতে কৃষকদের নিরাপদে পৌঁছনো নিয়ে সমস্যা।
স্থানীয়দের দাবি, উত্তরবঙ্গের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি অংশ এখনও সম্পূর্ণ ভাবে বেড়াবন্দি নয়। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক দিকে প্রয়োজন দ্রুত বেড়া নির্মাণ, অন্য দিকে ইতিমধ্যে বেড়া দেওয়া এলাকায় ভারতীয় কৃষকদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা।
বিএসএফের নিরাপত্তা চান কৃষকেরা
কৃষকদের দাবি, কাঁটাতারের ওপারে থাকা ভারতীয় জমিতে চাষের মরসুমে বিএসএফের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। নির্দিষ্ট গেট দিয়ে কৃষকদের যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রয়োজনে দল বেঁধে কৃষকদের জমি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া এবং ফেরার সময় তাঁদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী রাখার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
বেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান রঞ্জিত রবিদাসের বক্তব্য, সীমান্তের কৃষকেরা আতঙ্কিত। ভারতীয় ভূখণ্ডে কৃষকদের হেনস্থার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বেড়াহীন অংশে দ্রুত বেড়া দেওয়ার পাশাপাশি বেড়ার ওপারে থাকা ভারতীয় জমিতে যাতায়াতকারী কৃষকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত কুমার রায় জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের আইজির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। কৃষকদের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বিএসএফকে অনুরোধ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। রাজগঞ্জের বিধায়ক দীনেশ সরকারও কৃষকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নজরদারি বাড়ানোর দাবি
সাম্প্রতিক ঘটনার পরে সীমান্তে বিএসএফের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। সীমান্ত চৌকিগুলিতে সতর্কতা বাড়ানোর পাশাপাশি কাঁটাতারের ওপারে ভারতীয় জমিতে যাওয়া কৃষকদের গতিবিধির উপরেও নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু কৃষকদের প্রশ্ন, প্রতিটি জমিতে পুলিশ বা বিএসএফ মোতায়েন সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার। কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি, গেট ব্যবস্থার উন্নতি, আগাম তথ্য নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা-সহ জমিতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা—এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চান তাঁরা।
চাষ বন্ধ হলে প্রশ্ন শুধু কৃষকের নয়
সীমান্তে এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এই জায়গাতেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় কৃষকেরা কাঁটাতারের ওপারে থাকা নিজেদের জমিতে চাষ করে আসছেন। সেই জমিই যদি নিরাপত্তার কারণে তাঁরা ছেড়ে দেন, তা হলে সমস্যাটি আর ব্যক্তিগত জীবিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা কৃষিজমি ও চা-বাগানের উৎপাদন কমবে, সীমান্তবর্তী অর্থনীতিতে চাপ পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে জমি অনাবাদি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে।
উকিল বর্মনের ঘটনার পর দীপঙ্কর গোপের ঘটনায় তাই সীমান্তের কৃষকদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—জমি ভারতের, কৃষকও ভারতীয়। তা হলে নিজের জমিতে দু’মুঠো ফসল ফলাতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে কেন?
কাঁটাতারের বেড়া সীমান্তকে আলাদা করেছে। কিন্তু বেড়ার ওপারে পড়ে থাকা ভারতীয় জমির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক তো আলাদা করা যায়নি। সেই সম্পর্কই এখন নিরাপত্তার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে।