কাঠমান্ডু: পাহাড় কেঁপেছিল। নদী ফুলে উঠেছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে বরফ, পাথর, কাদা আর জলের উন্মত্ত স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর থেকে মানুষ— সব কিছু। প্রথমে মনে হয়েছিল, নেপাল-চিন সীমান্তে শক্তিশালী ভূমিকম্পই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত করেছে। কিন্তু ভয়াবহ সেই অনুমানই এখন বদলে গেল। আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা ইউএসজিএস-এর নতুন বিশ্লেষণ বলছে, ভূমিকম্প নয়, হিমবাহের বিশাল অংশ ধসে পড়ে তৈরি হওয়া বরফ-পাথরের ধস এবং তার পরের ‘ডেব্রিস ফ্লো’-ই নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের মূল কারণ। সেই ধসের অভিঘাতেই ভূমিকম্পের মতো কম্পন তৈরি হয়েছিল।
বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার তিব্বত সীমান্তের কাছে আচমকাই বিপর্যয় নামে। লেন্দে নদীর উপত্যকায় হিমবাহের বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে নীচে নেমে আসে। ধসের বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথে গিয়ে পড়ে। তৈরি হয় কার্যত একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ। তার পিছনে জল জমতে থাকে। পরে সেই বাধা ভেঙে যেতেই একসঙ্গে ছুটে নামে জল, বরফ, পাথর ও কাদার ভয়ঙ্কর স্রোত।
সেই স্রোত প্রথমে লেন্দে নদী দিয়ে নেমে ভোতে কোশি নদীতে মেশে। পরে তিমুরে এলাকা পেরিয়ে ত্রিশূলী নদীর দিকেও তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি নদীর সরু উপত্যকার মধ্যে জলের গতি এতটাই দ্রুত ছিল যে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের হাতে কার্যত সতর্ক হওয়ার সময় ছিল না। চোখের সামনে মুহূর্তে বদলে যায় নদীর চরিত্র, স্বচ্ছ জলের জায়গায় নেমে আসে কালো কাদা, বিশাল পাথর, বরফ আর গাছের গুঁড়ি মেশানো ধ্বংসের স্রোত।
ইউএসজিএস-এর ব্যাখ্যাতেই বদলেছে গোটা ছবিটা। প্রথম পর্যবেক্ষণে ঘটনাটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। পরে ভূকম্পন-তরঙ্গের আরও বিশ্লেষণ এবং উপগ্রহ-চিত্র পরীক্ষা করে সংস্থাটি জানায়, ওই কম্পনের শক্তি আসলে ভূমিকম্পের কারণে তৈরি হয়নি। বরং হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে নেমে আসা বিপুল ধ্বংসাবশেষই ভূকম্পন-যন্ত্রে প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন তৈরি করেছিল।
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝা যাচ্ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যাতেও। বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপাল ও চিনের সীমান্তবর্তী এলাকায় মৃতের সংখ্যা ১৬২-তে পৌঁছেছে। নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও প্রাণহানি হয়েছে। এখনও কয়েকশো মানুষ নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে পর্যটক, তীর্থযাত্রী, নিরাপত্তাকর্মী এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও রয়েছেন। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় বহু বিদেশি পর্যটক ও ভারতীয় তীর্থযাত্রীও এই অঞ্চলে ছিলেন।
বন্যার জেরে একাধিক সেতু ও রাস্তা কার্যত নিশ্চিহ্ন। বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সীমান্তবর্তী যোগাযোগ পরিকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। নেপাল সেনা ও প্রশাসনের পাশাপাশি হেলিকপ্টারে চলছে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান। নদীর ধার এবং নীচু এলাকায় থাকা মানুষকে এখনও সতর্ক করা হয়েছে।
এর মধ্যেই আরও একটি আশঙ্কা সামনে এসেছে। পাহাড়ি নদীর উজানে বরফ-পাথরের ধসের ফলে কোথাও জল আটকে থাকলে, সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ফের ভেঙে নতুন করে হড়পা বান নামতে পারে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলিকেও এক দিকে নিখোঁজদের খুঁজতে হচ্ছে, অন্য দিকে নজর রাখতে হচ্ছে নদীর উজানের পরিস্থিতির দিকে।
এই বিপর্যয় তাই শুধুমাত্র একটি পাহাড়ি বন্যার ঘটনা নয়। হিমালয়ের দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশও নতুন করে সামনে চলে এসেছে। উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে অস্থির বরফ ও পাথরের স্তর, কোথাও বাড়ছে হিমবাহ-নির্ভর জলাধারের ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে সামান্য প্রাকৃতিক অস্থিরতাও বড় ধস বা আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
অর্থাৎ, নেপালে পাহাড় কাঁপার শব্দটি ছিল বিপদের পূর্বাভাস নয়, বিপর্যয়েরই শব্দ। ভূমিকম্পের মতো যে কম্পন মাটিতে অনুভূত হয়েছিল, তার উৎস ছিল পাহাড়ের গায়ে হিমবাহের ভেঙে পড়া। আর সেই এক ধসই কয়েক মিনিটে পরিণত হয়েছিল জল, বরফ, পাথর ও কাদার এক ভয়ঙ্কর ‘জলবোমায়’।