সুন্দরবন, নিউজ ডেস্ক: কখনও বাঁশ, কখনও দড়ি, আবার কখনও মাটি ও ইটের মতো চেনা উপকরণ। এই সামান্য জিনিসগুলি যে একদিন দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনার কারণ হয়ে উঠবে তা হয়তো ভাবেননি সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও। হারিয়ে যেতে বসা পুরনো নির্মাণ কৌশলকে আঁকড়ে ধরে তৈরি হয়েছিল যে পথ, এবার সেই পথে পৌঁছে গেল বহু দূরের এক দেশে। এ যেন গোটা এলাকার এক গর্বের বিষয়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা মথুরাপুর ২ নম্বর ব্লকের রায়দিঘী বিধানসভার নগেন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্ব শ্রীধরপুরে কয়েক বছর আগে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘মুক্তি’। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, স্বনির্ভরতা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে করতে এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও সাফল্যের নজির গড়ল মুক্তি। বাংলাদেশের ঢাকার BRAC University-তে আয়োজিত একটি কর্মশালায় অংশ নেয় ‘মুক্তি’র দুই সদস্যের দল। সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে হাতে-কলমে তুলে ধরা হয় লৌহজাত সামগ্রী ছাড়াই নির্মাণের একাধিক প্রাচীন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। শুধুমাত্র তাত্ত্বিক আলোচনা নয় কর্মশালায় হাতে কলমে এই পদ্ধতি গুলির ব্যবহার শেখানো হয়।
একইসঙ্গে, কর্মশালায় নেপাল থেকে অংশ নেন দুই আর্কিটেক্টও। ‘মুক্তি’র পক্ষ থেকে কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্স থেকে আসা প্রশিক্ষক ও শিক্ষক ফ্রানার লরেন্স, যিনি ‘লোহা বাবু’ নামে পরিচিত, প্রশিক্ষক রাজমিস্ত্রি অলক কুমার হালদার। কর্মশালায় মোট চার ধরনের নির্মাণ প্রযুক্তি হাতে-কলমে দেখানো হয়। এর মধ্যে ছিল সেন্টারিং ছাড়া ইটের ছাদ তৈরি, সেন্টারিং ব্যবহার করে ইটের ছাদ তৈরি, বাঁশের স্যালো ডোম ছাদ নির্মাণ এবং সম্পূর্ণ ইট, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে লোহা ছাড়াই ইটের সিঁড়ি তৈরি।
সংস্থার দাবি, এই প্রযুক্তিগুলি বহু পুরনো হলেও বর্তমানে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রচলিত কংক্রিটের ছাদের তুলনায় এই ধরনের নির্মাণে খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং লোহার ব্যবহার না থাকায় নির্মাণের ধরনও অনেকটাই পরিবেশবান্ধব।বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই মুক্তির উদ্যোগে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী বহুল এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে স্বল্প খরচে তৈরি হচ্ছে এই বাড়িগুলো, যা সুন্দরবনের মানুষকে নতুন দিশা দেখিয়েছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে তা বিকল্প নির্মাণের একটি পথ হয়ে উঠেছে।
ঢাকার কর্মশালায় এই পুরনো নির্মাণ প্রযুক্তিগুলির ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখানোর পর বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রশংসা পায় ‘মুক্তি’র দল। কর্মশালা শেষে সাফল্যের স্বীকৃতিও মেলে তাঁদের হাতে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি সংস্থার এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত এলাকার মানুষ। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে থেকে উঠে আসা এই প্রযুক্তি এবার দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ায় ‘মুক্তি’র মুকুটে যুক্ত হল আন্তর্জাতিক পালক। তাই, এলাকার মানুষের কাছে এ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
