নিউজ ডেস্ক: প্রায় এক শতাব্দী আগে ব্রিটিশ শাসনের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে দুই বাঙালি যুবক সাইকেলে চড়ে বিশ্ব জয় করেছিলেন, বিমল মুখার্জি ও রামনাথ বিশ্বাস। ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তাঁদের এই অসাধারণ অভিযাত্রা নতুন আলোয় সামনে এসেছে।
১৯০৩ সালে বর্তমান ওডিশার গঞ্জাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন বিমল মুখার্জি, অন্যদিকে, ১৮৯৪ সালের বাংলাদেশের হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন রামনাথ বিশ্বাস। জাপানে অনুষ্ঠিত আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে বিমল মুখার্জি ও রামনাথ বিশ্বাসের বিশ্বভ্রমণ ব্রিটিশদের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যেখানে ভারতীয়দের শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতার বিষয়ে নানা ঔপনিবেশিক বদ্ধ ধারণার প্রচলন ছিল।
বিমল মুখার্জি সাইকেলে চষে বেড়ান ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত। অভাবের তাড়নায় কখনো ফটোগ্রাফার, কখনো নাবিক, আবার কখনো খামারে কাজ করে জোগাড় করেছেন ভ্রমণের খরচ। তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে লেখা আছে, এই যাত্রায় তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, এমনকি মেরি কুরির মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বের। তিনি বিভিন্ন মহাদেশের দূরতম ও অদ্ভুত সব জায়গায় বাঙালিদের দেখা পেয়েছিলেন। তিনি তার লেখনীতে ভূগোল ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সময় ও স্থানের ভেদ ঘুচিয়ে বাঙালি ডায়াস্পোরাকে একসূত্রে বেঁধেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে স্থানচ্যুত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন অনেক বাঙালি কিন্তু যুদ্ধের পর যখন রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়, তখন তাদের অনেকে দেশে ফিরতে না পেরে আরব ভূমিতে বসবাস শুরু করেছিলেন। তারা অনেকেই আরব নারীদের বিয়ে করেছিলেন। বিমল মুখার্জীর লেখা থেকে এমনটাই জানা যায়।
অন্যদিকে, রামনাথ বিশ্বাসের জীবন ছিল আরও রাজনৈতিক। সিঙ্গাপুরের কেরানি হিসাবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি উপনিবেশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রামনাথ তাঁর বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতায় সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তাঁর আফ্রিকা ভ্রমণবৃত্তান্তে তিনি লিখেছেন, যত দিন না ভারতীয়রা আফ্রিকানদের সঙ্গে সমতাভিত্তিক আচরণ করছে, ততদিন তাদের ইউরোপীয়দের কাছে সম-আচরণের দাবি করার নৈতিক অধিকার নেই। রামনাথ বরাবর ব্রিটিশদের অনুগত বাঙালিদের সমালোচনা করেছেন।
পৃথিবীর দূরতম প্রান্তেও সিলেটি বাঙালিকে পেয়ে যাওয়াটা ছিল বিমল ও রামনাথের ভ্রমণের সাধারণ ঘটনা। যেমন, বিমল কিউবায় এক সিলেটির দেখা পেয়েছিলেন আর রামনাথ পেয়েছিলেন জাঞ্জিবারে।
গবেষক সৌভিক নাহার মতে, এই সাইকেলযাত্রা কেবল ভ্রমণের আনন্দ ছিল না; এটি ছিল এক উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের মাধ্যম। ট্রেনের জানলার বাইরে ঝাপসা দৃশ্য দেখার চেয়ে সাইকেলের ধীর গতি তাঁদের সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই সরাসরি যোগাযোগ তাঁদের ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেছিল।
তৎকালীন ব্রিটিশরা ভারতীয়দের শারীরিকভাবে দুর্বল ও পরনির্ভরশীল বলে যে ধারণা ছড়িয়েছিল, এই দুই দুঃসাহসী যুবকদের হাজার হাজার কিলোমিটার ধরে সাইকেলের প্রতিটি প্যাডেল ঘোরানোই ছিল সেই ধারণার প্রতি এক একটি নীরব প্রতিবাদ। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, ভারতীয় পরিচয় কোনো ঔপনিবেশিক ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের এই লড়াই আমাদের শিখিয়েছে যে স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, সমতা ও আত্মপরিচয়েরও লড়াই।
