কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বড় প্রকল্পের সূচনা হতে চলেছে নিউ টাউনে। আদানি গোষ্ঠীর উদ্যোগে তৈরি হতে চলেছে ২,০০০ শয্যার ‘আদানি আরোগ্য নিকেতন’। বৃহস্পতিবার এই প্রকল্পের ভূমিপুজো ও শিলান্যাস ঘিরে শিল্প ও স্বাস্থ্য, দুই ক্ষেত্রেই নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি নিউ টাউনের অ্যাকশন এরিয়া-২ এলাকায় প্রায় ৫১.৭৫ একর জমির উপর গড়ে উঠবে বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ১,০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা ছিল। পরে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিধি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্পের ক্ষমতা দ্বিগুণ করে ২,০০০ শয্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নবান্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। নির্মাণকাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে মোট বিনিয়োগের অঙ্ক ২,৫০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
এই হাসপাতালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলির একটি হল চিকিৎসা পরিষেবার সামাজিক কাঠামো। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ২,০০০ শয্যার মধ্যে ১,০০০টি শয্যা সাধারণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র খরচে চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি যোগ্য রোগীরা আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধাও পেতে পারেন বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
বাকি ১,০০০ শয্যা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। ফলে একই পরিকাঠামোর মধ্যে সাশ্রয়ী চিকিৎসা এবং উন্নতমানের বিশেষায়িত চিকিৎসা, দুই ধরনের পরিষেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক সংযোগও রয়েছে। হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিষেবার মান ও চিকিৎসা পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য আমেরিকার অন্যতম পরিচিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান Mayo Clinic-কে গ্লোবাল কনসালট্যান্ট হিসেবে যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই প্রকল্পকে ঘিরে রাজ্যের অর্থনীতিতেও সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব সামনে এসেছে। নবান্নের হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু হলে সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান, চিকিৎসা-পর্যটন এবং স্বাস্থ্য গবেষণার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪,০৮৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুফল তৈরি হতে পারে। তবে এটি সরকারের করা সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবের হিসাব; প্রকল্প চালু হওয়ার পর বাস্তব ফলাফল তার থেকে ভিন্ন হতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও একাধিক সুবিধা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। জমির চরিত্র পরিবর্তন এবং বিভিন্ন ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রায় ১,৯৬৭ কোটি টাকার রাজস্ব মকুবের হিসাব সামনে এসেছে। অর্থাৎ হাসপাতাল প্রকল্পটি শুধু বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে রাজ্যের জমি, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সহায়তাও যুক্ত রয়েছে।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে পূর্ব ভারতে বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় হাসপাতাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। একই সঙ্গে নিউ টাউনকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য পরিষেবা, চিকিৎসা-পর্যটন, গবেষণা এবং দক্ষ কর্মসংস্থানের নতুন পরিসর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এখন নজর থাকবে নির্মাণকাজের গতি, বিনিয়োগের পরবর্তী ধাপ এবং হাসপাতালটি কবে থেকে সাধারণ মানুষের জন্য পরিষেবা চালু করে তার দিকে। ২,০০০ শয্যার এই প্রকল্প বাস্তবে কতটা বড় পরিবর্তন আনে, তার উত্তর মিলবে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পরই।
