নিউজ ডেস্ক: একদিকে আধুনিক যুদ্ধবিমান, অন্যদিকে আকাশে হেলিকপ্টারের মহড়া। তার মাঝেই ছয় দশকের পুরনো একটি গাড়িতে চড়ে নজর কাড়লেন ভারতীয় বায়ুসেনাপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং। গাড়িটির নম্বর প্লেট ‘IAF 1’। ১৯৬৭ সালে তৈরি এই মার্কিন গাড়ি একসময় টানা ২৩ বছর ধরে ভারতীয় বায়ুসেনার একের পর এক প্রধানকে বহন করেছে। বর্তমানে গাড়িটি সংরক্ষিত রয়েছে দিল্লির পালামে বায়ুসেনার জাদুঘরে।
৯৪তম ভারতীয় বায়ুসেনা দিবস উপলক্ষে গাজিয়াবাদের হিন্ডন এয়ারবেসে বিশেষ অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক গাড়ি আবারও আলোচনায় উঠে আসে। পুরনো দিনের স্মৃতি বহনকারী গাড়িটি শুধু একটি যান নয়, ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৬৯ সালে বায়ুসেনায় অন্তর্ভুক্তি
গাড়িটি ১৯৬৭ সালের মডেলের ফোর্ড স্যালুন। ১৯৬৯ সালের ৩০ জুলাই এটি ভারতীয় বায়ুসেনায় অন্তর্ভুক্ত হয়। তৎকালীন বায়ুসেনাপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল পি সি লাল ছিলেন গাড়িটির প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যবহারকারীদের মধ্যে অন্যতম। এরপর ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তাঁর উত্তরসূরি একাধিক বায়ুসেনাপ্রধান এই গাড়ি ব্যবহার করেন।
১৯৯৩ সালের ১০ জুন তৎকালীন বায়ুসেনাপ্রধান এন সি সুরি গাড়িটি বায়ুসেনার জাদুঘরে তুলে দেন। সেখানেই এখন ঐতিহাসিক গাড়িটি সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ অনুষ্ঠান ও স্মরণীয় উপলক্ষে মাঝেমধ্যে সেটিকে বাইরে আনা হয়।
মার্কিন বিলাসবহুল গাড়ির বিশেষত্ব কী?
ফোর্ড স্যালুনটির অন্যতম আকর্ষণ হল এর বাঁ-দিকে স্টিয়ারিং। ভারতে সাধারণত ডানদিকে স্টিয়ারিংযুক্ত গাড়ি দেখা গেলেও, আমেরিকার রাস্তার জন্য তৈরি এই গাড়িতে রয়েছে বাঁ-দিকের স্টিয়ারিং ব্যবস্থা।
গাড়িটিতে রয়েছে V8 ইঞ্জিন, যা প্রায় ৩১৫ ব্রেক হর্সপাওয়ার শক্তি উৎপাদনে সক্ষম। গাড়িটির সামনের গ্রিল, পিছনের ছাদের স্তম্ভে গোলাকার প্রতীক এবং চার দরজার নকশা দেখে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এটি ফোর্ডের ১৯৬৭ সালের LTD সেডান মডেলের সঙ্গে মেলে।
LTD ছিল ফোর্ডের জনপ্রিয় Galaxie পরিবারের বিলাসবহুল গাড়িগুলির অন্যতম। ১৯৫০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সিরিজের গাড়ি আমেরিকায় জনপ্রিয় ছিল।
রোলস-রয়েসের সঙ্গে তুলনা হয়েছিল যে গাড়ির
ষাটের দশকে ফোর্ড তাদের গাড়ির আরাম ও নিঃশব্দে চলার বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রচার করত। ১৯৬৫ সালের একটি বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছিল, পরীক্ষায় ফোর্ড গ্যালাক্সির কয়েকটি মডেলের কেবিনের শব্দের মাত্রা দুটি রোলস-রয়েস সিলভার ক্লাউডের তুলনায় কম পাওয়া গিয়েছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ফোর্ড গাড়িটি রোলস-রয়েসের সমতুল্য বলে দাবি করেছিল। বরং সেই সময়ে আরামদায়ক ও বিলাসবহুল গাড়ি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল সংস্থাটি।
যুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষী
এই গাড়ির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পি সি লাল ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বায়ুসেনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে গাড়িটি ব্যবহারকারী বায়ুসেনাপ্রধানদের আমলে মিগ-২৩, মিগ-২৫ এবং মিরাজ ২০০০-এর মতো যুদ্ধবিমান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
আজকের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও প্রযুক্তিনির্ভর বায়ুসেনার মাঝে ‘IAF 1’ যেন অতীতের এক জীবন্ত স্মারক। ছয় দশক আগের এই মার্কিন গাড়ি মনে করিয়ে দেয়, সামরিক ইতিহাস শুধু যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এমন কিছু নিঃশব্দ সাক্ষীও, যাদের গল্প সময়ের সঙ্গে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
