শিকাগো: বন্ধুর সঙ্গে পার্টিতে গিয়েছিলেন ২১ বছরের তরুণী। নাচগান, পানীয়—সবই চলছিল। কিন্তু রাত বাড়তেই অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন তিনি। এর পরই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আলফা এপসিলন পাই নামে একটি ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে থাকা বাথরুমে তাঁর উপর যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠে এক যুবকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক জন যুবক নির্যাতন থামানোর চেষ্টা না করে উল্টে উল্লাস করছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ‘আমার পালা কখন?’ বলেও চিৎকার করেন বলে অভিযোগ। বন্ধুকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন তাঁর দুই সঙ্গী।
শেষ পর্যন্ত তাঁরা বাথরুমে ঢুকে তরুণীকে উদ্ধার করেন। ঘটনাটি ঘটেছে গত রবিবার ভোরে, আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আলফা এপসিলন পাই ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে আয়োজিত একটি পার্টিতে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্যাতনের অভিযোগকারী তরুণী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নন। তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর পর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। শিকাগো পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন, এমনকি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্কও নেই। তবে বুধবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগও দায়ের হয়নি।
পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, দুই বন্ধুর সঙ্গে ওই পার্টিতে গিয়েছিলেন তরুণী। সেখানে নাচগান ও পানীয় গ্রহণের পর তিনি অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। অভিযোগ, এর পর তিনি বাথরুমে গেলে এক যুবক তাঁর পিছনে সেখানে ঢোকেন। ওই সময় তাঁর উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ।
তরুণীর দুই বন্ধু তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির নীচের তলায় একটি বন্ধ বাথরুমের সামনে পৌঁছন। তাঁদের দাবি, সেখানে কয়েক জন যুবক দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা বাথরুমের ভিতরে কী ঘটছে, তা নিয়ে উল্লাস করছিলেন এবং ভিতরে ঢোকার জন্যও উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। বন্ধুরা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। অভিযোগ, এক যুবক তাঁদের মধ্যে এক জনের চুল ধরে টানেন। অন্য জন বাথরুমের দরজার তালা খোলার চেষ্টা করেন।
শেষ পর্যন্ত দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে তাঁরা তরুণীকে মেঝেতে বসে থাকা অবস্থায় দেখতে পান। পুলিশি নথি অনুযায়ী, সেই সময় তরুণী সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন না এবং তাঁর ও সেখানে উপস্থিত যুবকের পোশাক আংশিক খোলা ছিল। তরুণীর এক বন্ধু যুবকটিকে সরে যেতে বলেন। অভিযোগ, সে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে দেখানোর চেষ্টা করে। পরে বাড়ির বাইরে ওই যুবককে ধরার চেষ্টা করেন তরুণীর এক বন্ধু। তাঁর দাবি, নির্যাতনের অভিযোগের কথা জানানো হলে যুবকটি পাল্টা দাবি করে, তরুণী নাকি স্বেচ্ছায় ওই সম্পর্কে সম্মতি দিয়েছিলেন। তবে এই দাবি ও ঘটনার অন্য বিবরণ এখনও তদন্তাধীন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে এক সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের হাতে থাকা ক্যামেরার ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং গাড়ির নম্বর শনাক্ত করার ব্যবস্থার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে আরও বলা হয়েছে, চিহ্নিত ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আলফা এপসিলন পাইয়ের স্থানীয় শাখা দাবি করেছে, তাদের কোনও সদস্য ওই যৌন নির্যাতনের ঘটনায় অংশ নেননি বা ঘটনাটিকে উৎসাহও দেননি। সংগঠনের বক্তব্য, খবর পাওয়ার পর সদস্যেরা তরুণীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন এবং পার্টি বন্ধ করে দেন। সংগঠনের জাতীয় নেতৃত্বও জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শাখার অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। শিকাগোর এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভ্রাতৃসংঘের পার্টি এবং ক্যাম্পাসে যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত মাসে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন ছাত্রীর দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালে একটি ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে তাঁকে মাদক খাইয়ে একাধিক ব্যক্তি ধর্ষণ করেছিলেন। অভিযুক্তেরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওই ঘটনায় ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের হয়নি, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে পার্টি আয়োজনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যৌন হেনস্থার অভিযোগ তদন্তে রাজ্য পুলিশের সহায়তা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্য দিকে, অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়েও একাধিক হেনস্থা, নির্যাতন এবং অনিয়মের অভিযোগের পর ভ্রাতৃসংঘগুলির কার্যকলাপ নিয়ে পদক্ষেপ করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলি ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের বাইরে আয়োজিত পার্টিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? কোনও অনুষ্ঠানে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা বিপদের মুখে পড়লে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? আর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? শিকাগোর ঘটনায় তরুণীর দুই বন্ধুর হস্তক্ষেপ তাঁকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছে বলে অভিযোগে উঠে এসেছে। তবে বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী তথ্য পায় এবং কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর।





