ব্রিটেন: ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ, বসবাসের অনুমতি এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ করছে পর্তুগাল। এ বার সেই পথেই হাঁটার চাপ বাড়ছে স্পেনের উপরেও। সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনের নিষ্পত্তি এবং বিদেশিদের সামাজিক সংহতির প্রশ্ন ঘিরে ইউরোপের একাধিক দেশে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। এক দিকে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন, অন্য দিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি পরিষেবার উপর চাপ কমানোর দাবি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারগুলি। পর্তুগাল ইতিমধ্যেই অভিবাসন নীতিতে একাধিক পরিবর্তন এনেছে। সরকারের দাবি, নতুন নীতির ফলে অভিবাসনের প্রবাহ বৃদ্ধির গতি কমেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বসবাসের অনুমতিসংক্রান্ত আবেদনের বড় অংশের নিষ্পত্তি হয়েছে। অন্য দিকে, স্পেনে মরক্কো থেকে উত্তর আফ্রিকার স্পেনীয় ভূখণ্ড সেউতায় বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রবেশের ঘটনা নতুন করে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে এনেছে। সেই পরিস্থিতিতে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কঠোর করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে স্পেনের সরকার।
পর্তুগালের নীতিতে কী বদল এসেছে?
পর্তুগালে এক সময় এমন একটি ব্যবস্থা চালু ছিল, যার মাধ্যমে বৈধ ভাবে দেশে প্রবেশ করা কোনও বিদেশি নাগরিক চাকরি পেলে নির্দিষ্ট শর্তে বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু এই ব্যবস্থার ফলে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমে যায়। প্রশাসনিক জটিলতা এবং আবেদনের দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকায় ২০২৪ সালের জুনে সেই পথ বন্ধ করে দেয় সরকার। পরবর্তী সময়ে অভিবাসন আইনেও একাধিক সংশোধন আনা হয়। নতুন নীতির লক্ষ্য, কারা দেশে প্রবেশ করছেন, কোন উদ্দেশ্যে থাকছেন এবং তাঁদের বসবাসের অনুমতির আবেদন কী অবস্থায় রয়েছে, তার উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। পাশাপাশি, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা এবং যাঁরা বৈধ ভাবে দেশে বসবাস করছেন, তাঁদের সংহত করার উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
পর্তুগাল সরকারের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন অভিবাসন নীতির ফলে অভিবাসনের প্রবাহ বৃদ্ধির গতি ৮৫ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুরনো জমে থাকা আবেদনগুলির মধ্যে ৯৮ শতাংশের নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও জানিয়েছে সরকার। তবে এই পরিসংখ্যান অভিবাসীর মোট সংখ্যা ৮৫ শতাংশ কমে যাওয়ার অর্থ নয়। সরকারের বক্তব্য, অভিবাসন বৃদ্ধির গতিই কমেছে। অর্থাৎ, বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করাই তাদের লক্ষ্য।
পর্তুগাল সরকার আরও জানিয়েছে, বৈধ অভিবাসন এবং বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করছে না। নির্মাণ, কৃষি, পর্যটন, স্বাস্থ্য পরিষেবা-সহ একাধিক ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের পথ বজায় রাখাও সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
স্পেনের সামনে সেউতার সঙ্কট
স্পেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। মরক্কোর সীমান্তবর্তী সেউতা স্পেনের একটি স্বশাসিত ভূখণ্ড, যা উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত। ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম পথ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল অভিবাসন বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে মরক্কো থেকে সেউতায় বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবেশ করেন। সংবাদসূত্রের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭০ হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ওই অঞ্চলে ঢুকেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ পরে ফিরে গেলেও হাজার হাজার মানুষ, তাঁদের মধ্যে নাবালকরাও রয়েছেন, সেখানেই থেকে যান। এই ঘটনা স্পেনের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকে নতুন করে চাপে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে স্পেনের সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন দ্রুত খতিয়ে দেখা এবং যাঁদের থাকার আইনি ভিত্তি নেই, তাঁদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছে।
সেপ্টেম্বরের শেষে প্রকাশিত একটি খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে আশ্রয়ের আবেদন খারিজ হলে আবেদনকারীকে স্পেনের বাইরে থেকেই আপিল করতে হতে পারে। আবেদন পর্যালোচনার প্রচলিত প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই প্রস্তাবগুলি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক খসড়া ব্যবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। সরকারের তরফে আইন পরিবর্তনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা জানানো হলেও, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও রয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলি চূড়ান্ত ভাবে কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
কঠোর নীতির বিরোধিতাও রয়েছে
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তি হল, সীমান্তে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং মানবপাচার বা অবৈধ অভিবাসনচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কঠোর নীতির বিরোধীদের বক্তব্য, দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্পেনের একাধিক মানবাধিকার ও শরণার্থী সহায়তা সংগঠন প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, আশ্রয়ের আবেদন খতিয়ে দেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দুর্বল হলে যুদ্ধ, নিপীড়ন কিংবা অন্য বিপদের কারণে দেশ ছেড়ে পালানো মানুষের সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ কমতে পারে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা মেনেই যে কোনও পরিবর্তন করতে হবে বলে তাদের দাবি।
পর্তুগালের ক্ষেত্রেও অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে সে দেশের সাংবিধানিক আদালত অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলনের অধিকার সীমিত করার একটি প্রস্তাবের কয়েকটি অংশ আটকে দিয়েছিল। আদালতের মতে, প্রস্তাবিত বিধানের ফলে পরিবারগুলির বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং তা সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকলেও, সেই ক্ষমতার সাংবিধানিক ও মানবাধিকারগত সীমা রয়েছে।
রাজনীতির কেন্দ্রেও অভিবাসন
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, নির্বাচনী রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। দক্ষিণপন্থী দলগুলি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং বিদেশিদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের দাবি জানাচ্ছে। অন্য দিকে, উদারপন্থী ও বামপন্থী দলগুলির একাংশ বলছে, অভিবাসীদের শ্রম দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাঁদের অধিকার ও সামাজিক সংহতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। স্পেনে এই বিতর্কের সঙ্গে জুড়েছে আবাসন সঙ্কটও। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বৃদ্ধির কারণে বহু নাগরিকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলির একাংশ আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে অভিবাসনের যোগসূত্র তুলে ধরছে। তবে আবাসন সঙ্কটের পিছনে নির্মাণের ঘাটতি, বাড়ির জোগান, পর্যটনের প্রভাব এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। তাই সমস্যাটিকে শুধু অভিবাসনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়।
অন্যদিকে, পর্তুগাল ও স্পেন—দুই দেশেই পর্যটন, নির্মাণ, কৃষি এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। অভিবাসন অতিরিক্ত কঠোর হলে এই ক্ষেত্রগুলিতে কর্মী সঙ্কট বাড়তে পারে। আবার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে বসবাসের অনুমতি, আশ্রয়ের আবেদন এবং সরকারি পরিষেবা পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারগুলির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পর্তুগালের অভিজ্ঞতা স্পেনের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি উদাহরণ হতে পারে, কিন্তু দুই দেশের পরিস্থিতি এক নয়। পর্তুগাল মূলত বসবাসের অনুমতি ও অভিবাসন ব্যবস্থার প্রশাসনিক সংস্কারে জোর দিচ্ছে। স্পেনের ক্ষেত্রে সেউতার সীমান্তে বিপুল প্রবেশ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তি নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ বেশি। ফলে স্পেন শেষ পর্যন্ত পর্তুগালের মতো একই পথে হাঁটবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রস্তাবিত আইন, আদালতের অবস্থান, মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এবং দেশের শ্রমবাজারের প্রয়োজনের উপর। ইউরোপের সামনে প্রশ্নটি তাই শুধু অভিবাসীর সংখ্যা কমানো নয়। সীমান্তের নিরাপত্তা, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ, অর্থনীতির শ্রমিকের চাহিদা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার—এই চারটি বিষয়কে কী ভাবে একসঙ্গে সামলানো যায়, তার উত্তর খুঁজতেই এখন ব্যস্ত পর্তুগাল ও স্পেন।





