মুম্বই: বিয়ে ভাঙার আইনি প্রক্রিয়া কি এতটাই জটিল যে দাম্পত্য সম্পর্কে জড়াতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে? বিবাহবিচ্ছেদ, খোরপোশ এবং সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আইনি টানাপড়েন এড়াতেই কি বিয়ের বদলে লিভ-ইন সম্পর্ককে বেছে নিচ্ছেন দম্পতিরা? এ বার এই প্রশ্নগুলিই সরাসরি সাধারণ মানুষের সামনে রাখল মহারাষ্ট্র সরকারের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) সংক্রান্ত কমিটি। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, লিভ-ইন সম্পর্ক, উত্তরাধিকার এবং সন্তানের অধিকার নিয়ে মোট ৩৭টি প্রশ্নের মাধ্যমে নাগরিকদের মতামত জানতে চাইছে কমিটি। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত নিজেদের মতামত ও পরামর্শ জানাতে পারবেন সাধারণ মানুষ।
বৃহস্পতিবার এই উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করেছে কমিটি। প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন এই কমিটির দায়িত্ব মহারাষ্ট্রে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর জন্য সুপারিশ তৈরি করা এবং তার খসড়া প্রস্তুত করা। প্রস্তাবিত বিধিতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনগুলির পরিবর্তে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং অন্যান্য পারিবারিক বিষয়ে অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিয়ের ন্যূনতম বয়স কত হওয়া উচিত?
কমিটির প্রশ্নমালায় বিয়ের ন্যূনতম বয়স নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত চাওয়া হয়েছে। ১৮, ২১, ২৪ এবং ২৭ বছর—এই চারটি বিকল্পের মধ্যে কোন বয়সকে বিয়ের ন্যূনতম সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা উচিত, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, কোনও ব্যক্তি আইনত বিবাহিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নও রাখা হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচার, প্রথা ও রীতিনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও মতামত চেয়েছে কমিটি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রচলিত বিবাহরীতি বজায় রাখা উচিত, নাকি সবার জন্য একই ধরনের নিয়ম চালু করা প্রয়োজন, তা নিয়ে নাগরিকদের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারা পরস্পরকে বিয়ে করতে পারবেন না, সেই সংক্রান্ত নিষিদ্ধ সম্পর্কের তালিকা সব সম্প্রদায়ের জন্য এক হওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ এবং লিভ-ইন সম্পর্কের নিবন্ধনের জন্য একটি অভিন্ন ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে কমিটি। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি ও নথিভুক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা নিয়ম থাকবে, নাকি একটি সাধারণ কাঠামো তৈরি হবে, তা নিয়ে জনমত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
লিভ-ইন সম্পর্ক কি বাধ্যতামূলক ভাবে নথিভুক্ত করতে হবে?
প্রশ্নমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ লিভ-ইন সম্পর্ক। কোনও যুগল একসঙ্গে বসবাস শুরু করলে সেই সম্পর্ক নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত কি না, আবার সম্পর্ক শেষ হলেও নিবন্ধন বাতিল বা সংশোধনের নিয়ম থাকা দরকার কি না, তা জানতে চেয়েছে কমিটি। লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা কোনও নারীকে সঙ্গী ছেড়ে চলে গেলে তাঁর ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের অধিকার কী ভাবে সুরক্ষিত করা হবে, সেই বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি না থাকলে আর্থিক নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং বিচ্ছেদের পর দায়িত্ব নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই সমস্যার সমাধানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে কী ধরনের ব্যবস্থা থাকা উচিত, তা নিয়ে নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়েছে। এই ধরনের সম্পর্কে জন্ম নেওয়া শিশুদের অধিকার নিয়েও একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। তাদের উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে যত্ন পাওয়ার অধিকার কী ভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা জানতে চাইছে কমিটি। পাশাপাশি, নির্ভরশীল শিশুদের ভরণপোষণের জন্য সব ধর্মের ক্ষেত্রে একই আইন থাকা উচিত কি না, সেই প্রশ্নও রাখা হয়েছে। শিশুর হেফাজত নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় বা বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত দাবির পরিবর্তে শিশুর কল্যাণ ও সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রধান বিবেচনা করা উচিত কি না, তা নিয়েও মতামত চাওয়া হয়েছে।
বিবাহবিচ্ছেদের নিয়ম কি সবার জন্য এক হবে?
বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও অভিন্ন আইনি কাঠামোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে কমিটি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য বিচ্ছেদের কারণ ও আইনি প্রক্রিয়া আলাদা না রেখে একটি সাধারণ নিয়ম চালু করা উচিত কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ এবং প্রক্রিয়া এক হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। আদালতের বাইরে ধর্মীয় বা প্রথাগত পদ্ধতিতে বিবাহবিচ্ছেদ দেওয়ার ব্যবস্থাও বন্ধ করা উচিত কি না, তা নিয়ে নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়েছে। এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত আইন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আদালতের মাধ্যমে আইনি অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়। বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে। অন্য দিকে, আইনি সুরক্ষা ছাড়া দ্রুত বিচ্ছেদের সুযোগ থাকলে খোরপোশ, সম্পত্তি এবং সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রেখে কী ধরনের আইন তৈরি করা উচিত, তা নিয়ে জনমত সংগ্রহ করছে কমিটি।
উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকার?
সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়েও রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। সব ধর্মের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের উত্তরাধিকার সমান হওয়া উচিত কি না, উইল না করে কেউ মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি বণ্টনের জন্য অভিন্ন নিয়ম চালু করা দরকার কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কোনও ব্যক্তি নিজের উইলের মাধ্যমে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি পছন্দমতো কাউকে দিয়ে যেতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। এই বিষয়টি বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্পত্তির উত্তরাধিকার, পারিবারিক অধিকার এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রচলিত আইনে আলাদা ভাবে বিবেচিত হয়। কৃষিজমি ও পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়েও সাধারণ মানুষকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনের কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন, তা লিখিত ভাবে জানাতে পারবেন নাগরিকেরা।
ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রেখেই কি ইউসিসি?
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর প্রস্তাব নিয়ে সাধারণ মানুষের সামগ্রিক মনোভাবও জানতে চাইছে কমিটি। মহারাষ্ট্রে ইউসিসি কার্যকর করা উচিত কি না, এর ফলে আইনি বিরোধ কমবে কি না এবং পারিবারিক আইনের প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে কি না, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারবেন নাগরিকেরা। ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও মতামত চাওয়া হয়েছে। প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’, ‘না’ অথবা ‘মতামত নেই’—এই বিকল্পগুলির মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, প্রশ্নমালার দ্বিতীয় অংশে নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠনকে বিস্তারিত লিখিত পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, মানবাধিকার এবং প্রবীণদের কল্যাণ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলিও নিজেদের বক্তব্য জানাতে পারবে। ব্যক্তিগত ভাবে মতামত জানানো নাগরিকেরা চাইলে নিজেদের ধর্ম, জাতিগত শ্রেণি এবং লিঙ্গের পরিচয় উল্লেখ করতে পারবেন। তবে এই তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বিভিন্ন সংগঠনকে নিজেদের কাজের ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে।
ছয় মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা কমিটির
চলতি বছরের জুলাইয়ে মহারাষ্ট্র সরকার প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে। ছয় মাসের মধ্যে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর বিষয়ে সুপারিশ এবং খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের। শুধু অনলাইন প্রশ্নমালার উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন বিষয়ে জনপরামর্শ ও আলোচনা সভার আয়োজন করার কথাও জানিয়েছে কমিটি। তবে কমিটির কাজের পদ্ধতি নিয়ে ইতিমধ্যেই মতপার্থক্য সামনে এসেছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বম্বে হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আর সি চবন কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। জনমত সংগ্রহের পদ্ধতি এবং একটি বৈঠকে কমিটির সদস্য নন এমন এক ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিনি। পরে রাজ্য সরকার অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক শত্রুঘ্ন সিংকে কমিটির সদস্য তথা সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করে। এই পরিস্থিতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে মহারাষ্ট্র সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের আগে জনমত সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিয়ে থেকে বিচ্ছেদ, লিভ-ইন সম্পর্ক থেকে উত্তরাধিকার—ব্যক্তিগত জীবনের একাধিক সংবেদনশীল বিষয়ে সাধারণ মানুষ কী ভাবছেন, সেই মতামতের ভিত্তিতেই সুপারিশ তৈরির কাজ এগোবে। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ থাকায় এখন নজর, এই প্রশ্নগুলির উত্তরে মহারাষ্ট্রের নাগরিকেরা কী অবস্থান জানান।





