নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: জানলার বাইরে পৃথিবী। নীচে নীল গ্রহটা ছুটে চলেছে প্রতি সেকেন্ডে কয়েক কিলোমিটার গতিতে। চারদিকে সীমাহীন মহাকাশ। সেখানে মাটি নেই, মাঠ নেই, বাগান নেই। অথচ সেই মহাকাশেই এ বার পাতা তুললেন মহাকাশচারী, আর সেই পাতা গেল রান্নার পাত্রে!
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বসে এমনই এক অভিনব অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাসার মহাকাশচারী অনিল মেনন। প্রায় এক মাস ধরে মহাকাশ স্টেশনের ভিতরে বেড়ে ওঠা কেল এবং ওয়াসাবি মাস্টার্ড গ্রিনস থেকে পাতা সংগ্রহ করে সহযাত্রী জেসিকা মিয়েরের সঙ্গে খাবার তৈরি করলেন তিনি। সেই মুহূর্তের ভিডিয়োও প্রকাশ করেছেন অনিল।
একটা সময় ছিল, মহাকাশে মানুষ কী ভাবে বাঁচবে, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হত কল্পবিজ্ঞানের পাতায়। এ বার সেই ভবিষ্যতেরই ছোট্ট মহড়া চলছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। কারণ এই সবুজ পাতাগুলি শুধু খাবার নয়, বিজ্ঞানীদের কাছে আগামী দিনের মহাকাশ অভিযানের সম্ভাব্য ‘জীবনরসদ’।
নাসার ‘Veggie’ প্ল্যান্ট-গ্রোথ সিস্টেমে চাষ করা হয়েছিল কেল এবং ওয়াসাবি মাস্টার্ড গ্রিনস। প্রায় এক মাস ধরে সেগুলি বেড়ে ওঠে মহাকাশ স্টেশনের বিশেষ পরিবেশে। তার পর সময় হল ফসল তোলার। পৃথিবীর কৃষকের মতোই গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করলেন অনিল ও জেসিকা। তবে পার্থক্য একটাই—তাঁদের পায়ের নীচে তখন পৃথিবীর মাটি নেই।
পৃথিবীতে একটি গাছের বেড়ে ওঠার পিছনে মাধ্যাকর্ষণের বড় ভূমিকা রয়েছে। জল নীচের দিকে নামে, শিকড় মাটির ভিতরে ছড়িয়ে পড়ে, গাছ আলো খুঁজে উপরের দিকে বাড়ে। কিন্তু মহাকাশ স্টেশনে সেই স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। সেখানে মাইক্রোগ্র্যাভিটির মধ্যে জল, বাতাস, আলো এবং পুষ্টি—সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রিত ভাবে গাছের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। বিজ্ঞানীরা তাই জানতে চাইছেন, পৃথিবীর বাইরে কি সত্যিই মানুষ নিজের খাবার নিজে ফলাতে পারবে?
প্রশ্নটির উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যতের চাঁদ কিংবা মঙ্গল অভিযানের কথা ভাবা হচ্ছে বহু মাস বা বহু বছর ধরে। সেই দীর্ঘ যাত্রায় প্রতিদিনের খাবার পৃথিবী থেকে পাঠানো অত্যন্ত কঠিন। ওজন যত বাড়বে, মহাকাশযানের জ্বালানি ও খরচও তত বাড়বে। তার বদলে যদি মহাকাশচারীরা নিজেদের প্রয়োজনীয় কিছু খাবার মহাকাশেই ফলাতে পারেন, তা হলে বদলে যেতে পারে পুরো পরিকল্পনা।
তবে শুধু খাবারের জন্যই গাছ নয়। মহাকাশচারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও এই সবুজের গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মধ্যে একটি জীবন্ত গাছের বেড়ে ওঠা, তার সবুজ পাতা দেখা কিংবা নিজের হাতে ফলানো খাবার খাওয়া এক ধরনের মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি বসতি তৈরির পরিকল্পনায় তাই উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনিল মেননের এই ভিডিয়ো সেই ভবিষ্যতেরই যেন ছোট্ট একটি ছবি। আজ কয়েকটি কেলপাতা। আজ কয়েকটি ওয়াসাবি মাস্টার্ড গ্রিনস। কিন্তু কাল? হয়তো চাঁদের কোনও ঘাঁটিতে ছোট্ট গ্রিনহাউস। তার পর মঙ্গলের মাটিতে মানুষ নয়, প্রথমে গাছের শিকড়।
পৃথিবীর রান্নাঘর থেকে মহাকাশের রান্নাঘর, দূরত্বটা কয়েকশো কিলোমিটার নয়, আসলে কয়েকশো বছরের স্বপ্নের। অনিল মেননের হাতে তোলা সেই সবুজ পাতাগুলি তাই শুধু মহাকাশের খাবার নয়, পৃথিবীর বাইরে মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনের এক ছোট্ট মহড়া।