নয়াদিল্লি: রামলালার মন্দিরে ভক্তের দেওয়া টাকা। সেই দানের অর্থই বার বার সরানো হয়েছে! অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান চুরি-কাণ্ডে এ বার তদন্তের পরিধি আরও স্পষ্ট হল। সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা SIT-এর স্টেটাস রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মন্দিরের CCTV ফুটেজ বিশ্লেষণ করে 105টি অনুদান চুরির ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। সোমবার শীর্ষ আদালতে তদন্তের এই তথ্য জানান সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, CCTV ফুটেজ, সাক্ষীদের বয়ান এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঘটনার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়েছে, 25 সেপ্টেম্বরের মধ্যে চার্জশিট পেশ করা হবে। আদালতও সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে আইন মেনে চার্জশিটের বিষয়ে পদক্ষেপ করতে বলেছে। অর্থাৎ, এত দিন ধরে তদন্তের যে পর্ব চলছিল, তা এ বার দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে SIT-এর রিপোর্টের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। CCTV-তে কী ভাবে চুরির ঘটনা ধরা পড়েছে, কী ভাবে ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে, সাক্ষীদের বক্তব্যে কী তথ্য উঠে এসেছে, সবই আদালতের সামনে রাখা হয়। শীর্ষ আদালত সেই তথ্য নথিভুক্ত করেছে।
তবে মামলার সঙ্গে যুক্ত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আদালত SIT-এর সম্পূর্ণ রিপোর্ট আবেদনকারীদের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়নি। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়েছে, তারা এখনই মামলাটি সেশনস জজের হাত থেকে নিজেদের হাতে নিতে চাইছে না। পরবর্তী তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হলে আদালত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে। চুরির অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল, মন্দিরে কোটি কোটি টাকার দান ও মূল্যবান সামগ্রী জমা পড়ে, সেই অর্থ গণনা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থায় নজরদারি কতটা কড়া ছিল? আগের SIT তদন্তে এই ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতার কথা সামনে এসেছিল।
SIT-এর প্রাথমিক তদন্তে 27 এপ্রিল থেকে 5 জুন পর্যন্ত পাওয়া 45 দিনের CCTV ফুটেজ বিশ্লেষণ করে 70টি চুরির ঘটনা চিহ্নিত করার কথা প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই ফুটেজে গণনার কাজে যুক্ত কর্মীদের টাকা জামাকাপড়, পকেট বা জুতোর মধ্যে লুকিয়ে রাখার দৃশ্য ধরা পড়েছিল বলে তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী তদন্তে আরও তথ্য-প্রমাণ যুক্ত হওয়ায় এখন মোট 105টি ঘটনার কথা আদালতে জানানো হয়েছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছিল, অনুদানের টাকা গোনার ঘরে কর্মীদের প্রবেশ বা বেরোনোর সময় নিয়মিত তল্লাশি করা হত না। নির্দিষ্ট পোশাক ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও তা কার্যকর হয়নি বলেও SIT-এর প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমনকি কর্মীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও মোবাইল নিয়ে গণনার জায়গায় ঢোকার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
আগের তদন্তে চুরির অভিযোগের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথাও সামনে এসেছিল। CCTV ফুটেজে দেখা যায়, এক কর্মী ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সেটি আড়াল করছেন, আর অন্য জন সেই সুযোগে টাকা সরাচ্ছেন—এমন অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে। চুরি করা টাকা মন্দির চত্বরের বাথরুমে সাময়িক ভাবে লুকিয়ে রাখার অভিযোগও ছিল। পরে সুযোগ বুঝে সেই টাকা বাইরে নিয়ে যাওয়া হত বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যায়। শুধু নগদ টাকা নয়, ভক্তদের দেওয়া গয়না নিয়েও অভিযোগ উঠেছিল। আগের তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে কানের দুল, নাকের গয়না, চুড়ি এবং পায়ের গয়নার মতো সামগ্রী সরানোর অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে কোন সামগ্রী কত পরিমাণে চুরি হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব তদন্তের নথির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
এখনও পর্যন্ত এই মামলায় 8 জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের 13(1)(a) ধারাতেও মামলা করা হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টে জানানো হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন অবিনাশ শুক্ল, অনুকল্প মিশ্র, লাভকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু। এঁদের মধ্যে অধিকাংশই মন্দিরে অনুদানের টাকা গণনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্তের সূত্রে আরও জানা যায়, মন্দিরের অনুদান গণনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের একটি অংশ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আগের SIT রিপোর্টে নিয়োগপ্রক্রিয়া, নজরদারি এবং নগদ গণনার ব্যবস্থায় একাধিক ত্রুটির কথাও উঠে এসেছিল।
চুরির ঘটনা সামনে আসার পরে মন্দির ট্রাস্টের প্রশাসনিক ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন করা হয়েছে। ট্রাস্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্র পদ ছেড়েছেন। পরবর্তী সময়ে ট্রাস্টে CEO-কেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো চালু করা হয় এবং অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জিতেন্দ্র মিশ্রকে CEO করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। অনুদানের টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণের ব্যবস্থাতেও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। SIT-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মূল্যবান সামগ্রীর রসিদ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এবং সেগুলি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার লকারে রাখা হয়। অর্থাৎ, মন্দিরে আসা দান সামগ্রীকে হিসাবের আওতায় আনার ব্যবস্থা ছিল; তদন্তের মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই ব্যবস্থার কোথায় এবং কী ভাবে ফাঁক তৈরি হয়েছিল।
এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তের শেষ পর্ব। সুপ্রিম কোর্টে SIT জানিয়েছে, তদন্ত প্রায় শেষ। 25 সেপ্টেম্বর চার্জশিট পেশ হওয়ার কথা। তার পরে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপেই স্পষ্ট হবে, 105টি CCTV-চিহ্নিত ঘটনার মধ্যে কোন কোন অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরনের মামলা দাঁড়াচ্ছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আদালতে টিকছে। রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদান নিয়ে ওঠা এই অভিযোগ তাই শুধু চুরির মামলা নয়—মন্দিরের বিপুল দান ও মূল্যবান সামগ্রী গণনা, সংরক্ষণ এবং নজরদারির ব্যবস্থাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন নজর 25 সেপ্টেম্বরের চার্জশিট এবং পরবর্তী আদালত-পর্বে।