নিউ ইয়র্ক: আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে সরব হলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলির সমস্যার কথা তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধের সরঞ্জাম দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে গেলেও কৃষকের প্রয়োজনীয় সার বা জ্বালানি অনেক সময় সঠিক সময়ে পৌঁছয় না। এই বৈষম্যই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা প্রকাশ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
৩৬ বছর বয়সি বলেন্দ্র শাহ এ বছরের কনিষ্ঠতম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় বক্তৃতা করেছেন। নেপালের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র, রাইফেল এবং গোলাবারুদ বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। অথচ নেপালের একজন সাধারণ কৃষক প্রয়োজনের সময়ে বাজারদরে সার বা জ্বালানি পান না। তাঁর মতে, বিশ্ব এমন একটি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর, কিন্তু খাদ্য ও কৃষির প্রয়োজনীয় উপকরণের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা ততটা কার্যকর নয়।
এই প্রসঙ্গেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি শুধু নেপালের সমস্যা নয়। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলির সঙ্গে কথা বললেও একই ধরনের সমস্যার কথা শোনা যাবে বলে দাবি করেন তিনি।
বলেন্দ্রর বক্তব্য, যে পরিবেশ উত্তপ্ত করার ক্ষেত্রে এই দেশগুলির ভূমিকা নেই, অনেক সময় তার প্রভাব তাদেরই ভোগ করতে হয়। একইভাবে, যে যুদ্ধ তারা শুরু করেনি, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফলও তাদের উপর এসে পড়ে। তাঁর মতে, এখান থেকেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তৃতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রতি নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের পর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় ভারত, চিন ও নেপালকে নিয়ে একটি ‘হিমালয় জলবায়ু সহনশীল ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের অববাহিকায় প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। তাই এই অঞ্চলের জলবায়ু ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় কোনও একটি দেশের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত, চিন ও নেপালের মধ্যে উপগ্রহচিত্র, আবহাওয়া ও পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত বিনিময়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে জানান তিনি। এতে আগাম সতর্কতা তৈরি এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে তাঁর বক্তব্য।
একইসঙ্গে নেপালে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সময়ে ত্রাণ ও সহায়তা পাঠানোর জন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান বলেন্দ্র শাহ। তাঁর রাষ্ট্রপুঞ্জের বক্তব্যে তাই একদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সমালোচনা, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বার্তা, দুই দিকই উঠে এসেছে।
