নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে পালিত বাঙালির দুর্গা পুজো ও গোটা দেশজুড়ে পালিত নবরাত্রি চিরকাল চর্চায় থেকেছে এবং তা নিয়ে রাজনীতি হতেও বাকি থাকেনি। অথচ এই দুই উৎসবই একই দেবীকে উৎসর্গীকৃত। তাও কেন প্রতি বছরই নবরাত্রি বনাম দুর্গা পুজোর প্রশ্নটি ওঠে। এগুলি কি দুটি ভিন্ন নামে একই উৎসব, নাকি দুটি ভিন্ন ঐতিহ্য যা ঘটনাক্রমে একে অপরের সাথে মিলে যায়? দুর্গাপুজো আসলে নবরাত্রির দ্বিতীয়ার্ধে পালিত হয়, কিন্তু প্রতিটি উৎসব কোথায় এবং কী কী আচার-অনুষ্ঠানের সাথে উদযাপিত হবে তার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকে। তাই, এই দুই উৎসবকে অভিন্ন বলে মনে করলে উৎসগুলির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলি বাদ পড়ে যাবে।
নবরাত্রির অর্থ 'নয় রাত্রি'। ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যে নবরাত্রির ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে দুর্গার নয়টি রূপের নিত্যনৈমিত্তিক পুজো, যা সম্মিলিতভাবে নবদুর্গা নামে পরিচিত। এই একই সময়ের শেষ পাঁচ দিনে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গা পুজো। কিন্তু নবরাত্রির বেশিরভাগ অংশই প্যান্ডেল সংস্কৃতি, প্রতিমা বিসর্জন বা বাঙালি আচার-অনুষ্ঠানের পঞ্জিকা ছাড়াই পালন করা হয়। নবরাত্রির প্রধান তাৎপর্য নয়টি রাত দেবী শক্তির নয়টি ক্রমবিকাশমান পর্যায়কে উপাসনা করা। মায়ের এই নয়টি রূপ কোমল ও স্নিগ্ধ থেকে ক্রমশ উগ্র ও বিজয়ী রূপের দিকে অগ্রসর হয়। দেবীর নয়টি রূপ যাথাক্রমে - শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুশমান্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী। দশম দিনে অর্থাৎ দশেরাতে অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। গরবা, ডান্ডিয়া নবরাত্রির এক অভেদ্য অংশ।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো বছরের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব। উমা এখানে ঘরের মেয়ে রূপে পূজিত হন। চার সন্তান লক্ষ্মী , সরস্বতী, গণেশ এবং কার্তিককে সঙ্গে নিয়ে মা আসেন তাঁর বাপের বাড়িতে। বিশেষ করে কলকাতার রাস্তাঘাট সেজে ওঠে হাজার হাজার জমকালো থিমের প্যান্ডেলে। উৎসবের প্রধান পাঁচ দিনে এই প্যান্ডেলগুলিতে মানুষ ভিড় জমায়। দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানগুলি একটি নির্দিষ্ট ক্রম অনুসরণ করে পালিত হয়। ষষ্ঠীতে বোধন যা দেবীর মুখাবরণের আনুষ্ঠানিক উন্মোচন। সপ্তমীর কলা বৌ বা নবপত্রিকা স্নান, যেটি মূলত দেবীর নয়টি রূপের (ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা, কার্তিকী, শিবা, রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, চামুণ্ডা, লক্ষ্মী) প্রতীক। অষ্টমীর সন্ধিপূজা, যা অষ্টমী ও নবমী তিথির ঠিক সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় এবং উৎসবের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত হিসাবে বিবেচিত; এবং দশমীর সিঁদুর খেলা, যেখানে বিবাহিত মহিলারা প্রতিমার বিসর্জনের শোভাযাত্রার আগে প্রতিমা বরণ করেন এবং একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন।
দুই ক্ষেত্রেই শেষ দিনে দেবী দুর্গার হাতে অশুভ শক্তির বিনাশ হয়। একদিকে বাংলায় মহিষাসুরের পরাজয় অন্যদিকে উত্তর ভারতে ভগবান রামের হাতে রাবণের পরাজয়, যা রাবণের প্রতিমা পোড়ানোর মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।সুতরাং নবরাত্রি বনাম দুর্গাপূজা আসলে একটির সঙ্গে অন্যটির তুলনা নয়, দুটোই তার নিজস্ব স্বতন্ত্র আচার-অনুষ্ঠান এবং আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাসের সাথে জড়িত।
