বেঙ্গালুরু: পনেরো বছর ধরে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কাজ। আটটি সংস্থায় চাকরি করেছেন। ছ’মাস বিদেশেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজের উদ্যোগে SaaS ব্যবসা শুরু করার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু AI-এর দ্রুত উত্থানের সময়ে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর ফের চাকরিতে ফিরেছেন। এত অভিজ্ঞতার পরেও এখন তাঁর মনে হচ্ছে, এত বছরের জ্ঞান এবং দক্ষতা যেন হঠাৎই পুরনো হয়ে যাচ্ছে!
বেঙ্গালুরুর এক প্রযুক্তিকর্মীর এমনই স্বীকারোক্তি ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। Reddit-এর IndiaCareers ফোরামে নিজের অভিজ্ঞতা লিখে ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জামগুলি যত উন্নত হচ্ছে, নিজের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে তাঁর সংশয়ও তত বাড়ছে। এমনকি এত বছর ধরে যে কোড লিখেছেন, এখন পিছন ফিরে তাকালে তাঁর নিজেরই মনে হচ্ছে, সেগুলির সবটা হয়তো ‘প্রোডাকশন কোয়ালিটি’র ছিল না।
কিন্তু সমস্যা শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়। তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে নিজের উপর বিশ্বাসের প্রশ্নও। ওই প্রযুক্তিকর্মীর কথায়, ভাল বেতনের চাকরি পেয়েছেন, বড় পদেও কাজ করেছেন। বাইরে থেকে সাফল্য থাকলেও ভিতরে দীর্ঘ দিন ধরেই ‘ইমপোস্টার সিনড্রোম’-এর সঙ্গে লড়াই করছেন। অর্থাৎ, নিজের সাফল্য বা দক্ষতার যোগ্যতা নিয়ে বার বার সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
তিনি লিখেছেন, বাইরে থেকে নিজেকে দক্ষ এবং সফল হিসাবে তুলে ধরলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বার বার ব্যর্থতার অনুভূতি তাঁকে তাড়া করে। কর্মজীবনে এমন ম্যানেজারও পেয়েছেন, যাঁরা আরও ভাল করার জন্য তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন। আবার এমন ঊর্ধ্বতনও ছিলেন, যাঁরা সরাসরি তাঁর দক্ষতার অভাবের কথা বলেছেন। একটি চাকরি ছাড়ার সময় সেই আত্মবিশ্বাসের সংকট আরও গভীর হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। পরে আরও বড় একটি চাকরি পেলেও সেই মানসিক চাপ পুরোপুরি কাটেনি।
AI-এর প্রসঙ্গটি তাঁর সেই পুরনো সংশয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এত বছর ধরে যে কাজ করতে সময় লাগত, AI-এর বিভিন্ন টুল এখন তার অনেকটাই দ্রুত করে ফেলছে। ফলে অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার যে মূল্য এত দিন নিজের কর্মজীবনে দেখেছেন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তা কতটা টিকে থাকবে—সেই প্রশ্নই তাঁকে ভাবাচ্ছে।
এখানেই আরও একটি ভয় কাজ করছে। IT ছাড়া অন্য কোনও ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই। নতুন করে অন্য পেশায় যাওয়ার মতো আত্মবিশ্বাসও নেই। নিজের ব্যবসা শুরু করার মতো পর্যাপ্ত অর্থও নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে এক দিকে চাকরি ধরে রাখার প্রয়োজন, অন্য দিকে AI-এর কারণে নিজের দক্ষতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি।
পরিবারের কাছেও নিজের এই উদ্বেগের কথা বলতে পারেননি বলে জানিয়েছেন ওই ব্যক্তি। তাঁর পরিবারের কাছে তিনি এখনও অত্যন্ত সফল একজন মানুষ। কিন্তু নিজের ভিতরের অনিশ্চয়তা তাঁদের সামনে প্রকাশ করার মতো সাহস তাঁর হয়নি। তাঁর কথায়, IT শিল্পে এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা মাসের বেতন পাওয়ার জন্য কাজ করে চলেছেন। কিন্তু সেই উপলব্ধি তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছে না।
তাঁর পোস্টটি প্রকাশ্যে আসার পর অন্য প্রযুক্তিকর্মীরাও নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে শুরু করেন। কেউ বলেছেন, দীর্ঘ কর্মজীবন সত্ত্বেও তাঁরাও একই রকম আত্মসংশয়ে ভোগেন। ১৫-১৬ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা কয়েক জনও জানিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে তাঁদের নিজেদের দক্ষতা সম্পর্কে আগের মতো আত্মবিশ্বাস থাকে না। কেউ আবার তাঁকে নিজের পুরনো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু শেখা বা ওপেন-সোর্স প্রকল্পে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিষয়টি শুধু এক জন প্রযুক্তিকর্মীর ব্যক্তিগত উদ্বেগে সীমাবদ্ধ নয়। AI-এর দ্রুত প্রসার ইতিমধ্যেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের কাজের ধরন বদলাতে শুরু করেছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় IT সংস্থাগুলিও AI-নির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যবসায়িক মডেল বদলাচ্ছে এবং কর্মঘণ্টার বদলে কাজের ফল বা উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে পরিষেবার মূল্য নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছে।
তবে AI-এর উত্থান মানেই অভিজ্ঞ প্রযুক্তিকর্মীদের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত এই একটি পোস্ট থেকে টানা যায় না। বরং বেঙ্গালুরুর ওই কর্মীর লেখা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রশ্নটি শুধু নতুন সফটওয়্যার শেখার নয়; দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা থাকা কর্মীদের মধ্যেও নিজের দক্ষতা, চাকরির ভবিষ্যৎ এবং পেশাগত পরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
পনেরো বছরের অভিজ্ঞতার পরেও তাই তাঁর প্রশ্নটা একেবারে অন্য রকম, AI-এর যুগে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইটা শুরু হবে কোথা থেকে?