বিশেষ প্রতিবেদন: একটি বইয়ের স্টল। কয়েকটি টেবিল, বইয়ের স্তূপ, আর পথচলতি মানুষের সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার সুযোগ। এতেই যদি সরকারের অস্বস্তি হয়, তা হলে সেই অস্বস্তির কারণ খুঁজতে হবে বইয়ের পাতায়, নাকি ক্ষমতার রাজনীতিতে? দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সামনে সিপিএমের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে বিতর্কে কলকাতা হাইকোর্টের প্রশ্ন তাই নিছক প্রশাসনিক অনুমতির গণ্ডিতে আটকে নেই। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের মন্তব্য, ‘‘লটারির দোকান তো দিচ্ছেন না, বইয়ের দোকান দেবেন, অসুবিধা কী?’’ সঙ্গে স্পষ্ট সতর্কবার্তা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বর এ ভাবে দাবিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, ক্ষমতায় এসে কি তবে বিরোধী মতের জন্য জায়গা ক্রমশ ছোট করে দেওয়াই নতুন শাসনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি?
বনগাঁয় পুজোর মণ্ডপের সামনে সিপিএমের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে মামলার শুনানিতে আদালত জানতে চেয়েছে, অন্যদের স্টল বসানোর সুযোগ থাকলে সিপিএমকে বাধা দেওয়া হবে কেন? সিপিএমের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যে জায়গায় তারা পুজোর সময়ে বইয়ের স্টল বসিয়ে আসছে, এ বার সেখানে অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথচ সেখানে অন্য সংগঠনের স্টল রয়েছে। রাজ্যের তরফে পাল্টা যুক্তি, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি পূর্ত দফতরের অধীন এবং অনুমতির জন্য সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়নি। জমির মালিকানা ও অনুমতির প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই যুক্তি যদি সত্যিই মূল কারণ হয়, তা হলে একই জায়গায় অন্য স্টল কী ভাবে বসল, তারও ব্যাখ্যা দিতে হবে। আইন সবার জন্য এক হলে তার প্রয়োগও সবার ক্ষেত্রে এক হওয়া চাই। সরকারি নিয়মের আড়ালে রাজনৈতিক বাছবিচার চললে তাকে নিরপেক্ষ প্রশাসন বলা যায় না।
কিন্তু এই বিতর্কের গভীরতা আরও বেশি। কারণ, সিপিএমের বইয়ের স্টল নিয়ে আপত্তি হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। গত সেপ্টেম্বরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুজো কমিটিগুলিকে বলেছিলেন, সিপিএমের বইয়ের স্টলে ‘দুর্গাপুজো’র বদলে ‘শারদোৎসব’ লেখা থাকলে সেই স্টল বসতে দেওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ, বই বিক্রির প্রশ্নটি ক্রমে সরে গিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে উৎসবের নামকরণ। ‘দুর্গাপুজো’ না ‘শারদোৎসব’, কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের মীমাংসা কি স্টলের অনুমতি আটকে দিয়ে হবে? একটি সাংস্কৃতিক শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে কোনও রাজনৈতিক দলের বই বিক্রির সুযোগ বন্ধ করার বার্তা যদি দেওয়া হয়, তা হলে প্রশ্ন উঠবেই, এটি কি উৎসবের ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ, না কি সাংস্কৃতিক পরিসরের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা?
প্রশ্ন উঠছে, বাঙালির পুজো কি এতটাই ভঙ্গুর যে ‘শারদোৎসব’ শব্দটি লিখলেই তার ধর্মীয় পরিচয় বিপন্ন হবে? রবীন্দ্রনাথের নাটক থেকে বাংলা সাহিত্যের নানা ধারায় ‘শারদোৎসব’ শব্দের ব্যবহার রয়েছে। শব্দটি নিজেই কোনও ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক ঘোষণা নয়। দুর্গাপুজোকে কেউ ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখবেন, কেউ সামাজিক উৎসব হিসেবে, কেউ আবার শিল্প-সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিসর হিসেবে- বাংলার সমাজে এই বহুমাত্রিকতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেই ইতিহাসকে একটিমাত্র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে দেওয়ার চেষ্টা হলে ক্ষতি শুধু বামেদের হবে না; সংকুচিত হবে বাংলার সাংস্কৃতিক বহুত্বও।
এখানেই প্রশ্ন, সিপিএমের বইয়ের স্টলকে ভয় কিসের? স্টলে তো শুধু মার্ক্স, লেনিন বা কমিউনিস্ট আন্দোলনের বই থাকে না। সিপিএমের তরফে আগেই জানানো হয়েছে, তাদের বই বিক্রয়কেন্দ্রে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পরিবেশ, মানবাধিকার এবং শিশুদের জন্যও বই থাকে। রাজনৈতিক মতাদর্শের বই থাকবেই—সেটাই তো স্বাভাবিক। একটি রাজনৈতিক দলের বইয়ের স্টল তার মতাদর্শ প্রচারের জায়গা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। সেই বইয়ের সঙ্গে পাঠকের মতের মিল হতে পারে, অমিলও হতে পারে। পাঠক বই কিনবেন কি না, পড়বেন কি না, সমর্থন করবেন কি না—সিদ্ধান্ত তাঁর। কিন্তু পাঠকের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগটাই যদি প্রশাসনিক বাধায় আটকে যায়, তা হলে মতাদর্শের লড়াই আর যুক্তির ময়দানে থাকে না; চলে যায় ক্ষমতার দরজায়।
সরকারের ভয় বইয়ের বিক্রি নিয়ে, না কি বইয়ের ভিতরে থাকা প্রশ্নগুলি নিয়ে—এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, ক্ষমতা যখন নিজের মতাদর্শকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন বিকল্প চিন্তার পরিসর তার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। বইয়ের স্টল সেই অর্থে শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়। তা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের যোগাযোগের একটি পুরনো মাধ্যম। পুজোর ভিড়ে দাঁড়িয়ে কেউ হয়তো মার্ক্সের বই কিনবেন, কেউ ইতিহাসের, কেউ শিশুদের গল্প। কেউ বই কিনবেন না, তবু দাঁড়িয়ে পাতা উল্টে দেখবেন। এই সামান্য যোগাযোগও রাজনীতির পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনী সভার বাইরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছনোর সুযোগ দেয় এমন স্টল।
সিপিএমের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে বামেদের দীর্ঘ শাসনের অবসানের পরেও পুজোর বইয়ের স্টল তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতির পরিচিত চিহ্ন হয়ে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে এই স্টলগুলির মাধ্যমে তারা শুধু দলীয় সাহিত্য নয়, নানা ধরনের বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পরে কোনও দলের রাজনৈতিক প্রভাব কমতে পারে, জনসমর্থনও কমতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, জনপরিসরে তার উপস্থিতির অধিকারও কমে যাবে। বরং গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য যাচাই করার একটি মাপকাঠি হল, ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলি কতটা অবাধে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে।
এই জায়গাতেই শুভেন্দুর সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধীদের রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করা এক কথা, তাদের জনসংযোগের সুযোগ সংকুচিত করা আর এক। বিজেপি যদি মনে করে সিপিএমের মতাদর্শ ভুল, তা হলে সেই মতাদর্শের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচার করতে পারে। নিজেদের বইয়ের স্টল বসাতে পারে, নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। কিন্তু কোনও দলের বইয়ের স্টল বসবে কি না, তা যদি নির্ধারিত হয় সেই দল শাসকের পছন্দের কি না, তা দিয়ে, তবে গণতন্ত্রের প্রতিযোগিতা অসম হয়ে পড়ে। যে দল আজ ক্ষমতায়, কাল সে বিরোধীও হতে পারে। তখন কি সে চাইবে, তার বই, পত্রিকা বা রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের সুযোগও প্রশাসনিক পছন্দ-অপছন্দের উপর নির্ভর করুক?
অতীতের দিকে তাকালেও দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের স্টল নিয়ে অভিযোগের চরিত্র বদলেছে, কিন্তু বিতর্কটি নতুন নয়। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর প্রথম দিকের পুজোগুলিতেও সিপিএমের তরফে অভিযোগ উঠেছিল, বিভিন্ন এলাকায় তাদের প্রগতিশীল সাহিত্য বিক্রির স্টল বসাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও বাধা, কোথাও ভাঙচুরের অভিযোগ, কোথাও আবার স্থানীয় স্তরে চাপ তৈরির কথা সামনে এসেছিল। তখন ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল। সেই সময় বামেরা যে অভিযোগ তুলেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিরোধী দলের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি সংকুচিত করার চেষ্টা। আজ ক্ষমতার পালাবদলের পরে একই ধরনের অভিযোগ নতুন শাসকের বিরুদ্ধে উঠছে। সময় বদলেছে, শাসকের নাম বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছে—ক্ষমতা কি বিরোধী মতের জন্য জায়গা রাখতে শিখেছে?
এই তুলনা অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও দাবি করে। অতীতে কোনও দল বাধা দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছিল বলেই বর্তমান অভিযোগ স্বয়ংক্রিয় ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না। একই ভাবে, আজকের সরকার আগের সরকারের সমালোচনা করত বলেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খারিজ করা যায় না। প্রতিটি ঘটনার তথ্য, অনুমতির নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নটি আলাদা। যে দল এক সময় বিরোধী কণ্ঠস্বরের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে, ক্ষমতায় এসে তারও সেই অধিকার রক্ষা করার দায় রয়েছে। অন্যের অন্যায়কে নিজের ন্যায়ের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
এই বিতর্কে প্রশাসনের যুক্তিও খতিয়ে দেখা জরুরি। রাস্তার উপর স্টল বসালে যান চলাচল, পথচারীদের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সরকারি জমির ব্যবহারের প্রশ্ন আসতেই পারে। নিয়ম ভেঙে কেউ স্টল বসালে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার প্রশাসনের রয়েছে। কিন্তু সেই নিয়ম কি শুধু সিপিএমের জন্য? অন্য সংগঠন একই জায়গায় স্টল বসালে তাদের অনুমতিপত্র কোথায়? সরকারি জমি হলে পূর্ত দফতরের অনুমতি কারা নিয়েছে? অনুমতির নিয়ম নতুন করে নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকলে তা কি সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে সমান ভাবে কার্যকর? হাই কোর্টের প্রশ্নের তাৎপর্য এখানেই—প্রশাসনকে শুধু নিয়মের কথা বললেই চলবে না, নিয়মের প্রয়োগে সমতা রয়েছে কি না, তারও জবাব দিতে হবে।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য পুলিশের কাছে রিপোর্ট চেয়ে জানতে চেয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জায়গায় কারা স্টল বসিয়েছে এবং তাদের অনুমতি রয়েছে কি না। রাজ্যের তরফে মামলাটি কোন বেঞ্চে শোনা উচিত, তা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। এই আইনি প্রশ্নগুলির নিষ্পত্তি আদালতের বিষয়। কিন্তু বিচারপতির মৌলিক পর্যবেক্ষণ, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বর দাবিয়ে দেওয়া উচিত নয়—তার গুরুত্ব আলাদা। কারণ, গণতন্ত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগেরও একটি সীমা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অজুহাত দিয়ে রাজনৈতিক অস্বস্তি মেটানো যায় না। আর অনুমতির জটিলতা যদি সত্যিই থাকে, তা হলে তার সমাধান স্বচ্ছ নিয়মে হতে হবে, বেছে বেছে বাধা দিয়ে নয়।
শুভেন্দুর সরকারের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু সিপিএমের একটি স্টলকে ঘিরে নয়। ক্ষমতায় এসে সরকার কি বাংলার জনপরিসরকে আরও বহুমতের জন্য খুলে দেবে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সেই পরিসরের দরজা খুলবে ও বন্ধ করবে? বিজেপি যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ‘দুর্গাপুজো’ শব্দটির উপর জোর দিতে পারে, তা তার রাজনৈতিক মত। কিন্তু সেই মতকে প্রশাসনিক শর্তে পরিণত করে অন্যের সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক প্রকাশকে আটকে দেওয়ার অধিকার তার নেই। রাষ্ট্রের কাজ কোনও একটি মতাদর্শকে সরকারি অনুমোদন দিয়ে বাকিগুলিকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া নয়। রাষ্ট্রের কাজ, সব পক্ষের জন্য ন্যায্য পরিসর নিশ্চিত করা।
এখানে সিপিএমের রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীত শাসনের সমালোচনা অপ্রাসঙ্গিক নয়, কিন্তু সেটি এই নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরও নয়। বাম শাসনের সময় বিরোধীদের উপর প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ উঠেছে; তৃণমূল আমলেও বিরোধী দলের কর্মসূচি ও জনসংযোগের পরিসর নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে যদি নতুন সরকারও একই পথে হাঁটে, তা হলে পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার আসনে ঘটবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নয়। যে দল এক সময় অন্যায়ের অভিযোগ তুলেছিল, তারই ক্ষমতায় এসে সেই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটানো গণতান্ত্রিক অগ্রগতি নয়; বরং পুরনো চক্রের পুনরাবৃত্তি।
সবচেয়ে বড় কথা, বইয়ের স্টলকে ভয় দেখিয়ে বন্ধ করা গেলেও বইয়ের ভিতরে থাকা ধারণাকে বন্ধ করা যায় না। কোনও মতাদর্শের সঙ্গে লড়াই করতে হলে তার সঙ্গে বিতর্ক করতে হয়। যে বই ভুল তথ্য দেয়, তার ভুল ধরিয়ে দিতে হয়। যে রাজনৈতিক মতের সঙ্গে আপত্তি রয়েছে, তার বিরুদ্ধে পাল্টা মত তুলে ধরতে হয়। এই কাজ কঠিন, কিন্তু গণতন্ত্রের পথ সেটাই। প্রশাসনিক বাধা সহজতর মনে হতে পারে, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত শাসকের আত্মবিশ্বাস নিয়েই প্রশ্ন তোলে। যে মতাদর্শ নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করে, তাকে প্রতিপক্ষের বইয়ের স্টল দেখে এতটা বিচলিত হওয়ার কথা নয়।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রশ্ন তাই শুভেন্দুর সরকারের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও পড়া যেতে পারে। বিরোধীদের কণ্ঠস্বর রোধ করা গণতন্ত্রের কাজ নয়। লটারির দোকান আর বইয়ের দোকানের মধ্যে বিচারপতি যে পার্থক্য টেনেছেন, তার মর্ম শুধু দোকানের পণ্যে নয়; তার মর্ম জনপরিসরের চরিত্রে। বই মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, ক্ষমতার বক্তব্যের বাইরে অন্য কথাও শুনতে শেখায়। সেই কারণেই বইয়ের স্টল একটি গণতান্ত্রিক পরিসর। সেখানে মতের সংঘাত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, বিরোধ থাকবে- কিন্তু সেই বিরোধ মেটানোর উপায় নিষেধাজ্ঞা হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত সিপিএমের স্টল বসবে কি না, তার সিদ্ধান্ত আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কিন্তু এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। বাংলার পুজোকে যদি সত্যিই সর্বজনীন বলা হয়, তা হলে সেখানে শাসকের পছন্দের মতই শুধু জায়গা পাবে কেন? আর যদি সরকার মনে করে, সিপিএমের বইয়ের স্টল তার রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধী, তা হলে সেই বিরোধিতার জবাব দিক রাজনীতির ময়দানে। অনুমতির দরজা আটকে নয়।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বইয়ের স্টল কোনও সরকারের অনুগ্রহ নয়, গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের একটি স্বাভাবিক অধিকার। আজ সিপিএমের বইয়ের স্টল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; কাল অন্য কোনও বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও উঠতে পারে। তাই আসল পরীক্ষা সিপিএমের নয়, শুভেন্দুর সরকারের- ক্ষমতা কি বিরোধী মতকে সহ্য করতে পারে? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যে সরকার বইয়ের দোকান আর লটারির দোকানের পার্থক্য বুঝতে চায় না, তাকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার: গণতন্ত্রে ভোটে জেতা যায়, কিন্তু মানুষের চিন্তার উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।





