বিশেষ প্রতিবেদন: বঙ্গের রাজনীতি ও সংস্কৃতির সম্পর্ক বহু পুরনো। তবে চলতি বছরের শারদোৎসবে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সাক্ষী থাকছে বাংলা, তা এককথায় ঐতিহাসিক। রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর এটাই প্রথম দুর্গাপুজো। নবান্নে শাসক বদলের সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মেই বদলে গিয়েছে শহরের এককালের দাপুটে 'হেভিওয়েট' পুজো কমিটিগুলির পরিচালনা পর্ষদ এবং উদযাপনের আঙ্গিক। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পুজোর সার্বিক আমেজে কতটা প্রভাব ফেলল? এই বদল কি সংস্কৃতির মুক্তি, নাকি রাজনীতির নতুন মোড়ক? এই নিয়ে মুখর বাংলার বিশিষ্ট সমাজ ও রাজনীতির কারবারিরা।
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতায় দুর্গোৎসব মানেই ছিল ক্লাব রাজনীতির নিজস্ব বিন্যাস। এই কিছুদিন আগেও শহরের বড় পুজোগুলোয় তৃণমূলের নেতাদের একছত্র আধিপত্য ছিল। আজ সেখানে দায়িত্ব বদলেছে। নতুন রাজনৈতিক মুখ এসেছে কিংবা পুজো চলে গিয়েছে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের হাতে। শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব, সুরুচি সঙ্ঘ, চেতলা অগ্রণী কিংবা নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘের মতো মেগা পুজো ক্লাবগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন শাসকদলের প্রতিনিধি বা সহানুভূতিশীল বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এখন অনেক কমিটির রাশ ধরেছেন।
নতুন সরকার আসার পর অনুদানের পরিমাণ এবং প্রশাসনিক ছাড়পত্রের নিয়মে কিছু রদবদল হয়েছে। গ্রামীণ পুজো এবং ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারিগুলোকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিগত দু'দশকে দুর্গোৎসবের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে 'থিম পুজো'। কিন্তু ক্ষমতা বদলের পর এই ভাবনায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। এ বছরের পুজো মণ্ডপগুলোতে থিম ভাবনার পাশাপাশি সনাতনী রূপ এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
নতুন নেতৃত্বের দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে অনেক পুজোতেই এবার ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য, শিল্পকলা এবং পৌরাণিক গল্পের আধিক্য। অতীতে থিমের নামে যে বিপুল টাকা খরচ বা ভিড় সামলানোর জন্য দীর্ঘক্ষণের ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হত, তা নিয়ে একশ্রেণির ক্ষোভ ছিল। নতুন সরকারের প্রশাসনিক নির্দেশে এবার মণ্ডপে দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্য়ে অন্য়তম ভিআইপি পাসের বিলোপ।
প্রখ্যাত সমাজবিদ ও সাহিত্যিকদের একাংশের মতে, দুর্গাপুজো বরাবরই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছে। নব্বইয়ের দশকে সিপিএম বুকস্টল দিয়ে পুজোয় উপস্থিতি জানান দিত। তৃণমূল জমানায় তা ক্লাব-কেন্দ্রিক পুজোয় রূপ নেয়। নয়া জমানায় তা সনাতনী ঐতিহ্য ও স্বদেশিয়ানার মোড়ক পাচ্ছে। কিন্তু পুজো রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক গণউৎসব। তাকে যেন কোনও রাজনৈতিক আদর্শে বেঁধে না ফেলা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজ্য রাজনীতিতে দুর্গোৎসব নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, সরাসরি গণসংযোগের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। নতুন শাসকদল চাইছে পুরনো রাজনৈতিক প্রভাব বলয় ভেঙে নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এটাকে 'সাংস্কৃতিক দখলদারিত্ব' বলে তোপ দাগছে।
ক্ষমতার রং বদলালেও বাঙালির চিরন্তন পুজোপ্রেম কি এতটুকু কমেছে? রাজনীতি বা সরকার পরিবর্তনের প্রভাব প্রশাসনিক বা কমিটি স্তরে থাকলেও, সাধারণ মানুষের আবেগ রয়েছে একদম একই জায়গায়। মহালয়ার ভোর থেকে মণ্ডপে মণ্ডপে যে জনজোয়ার দেখা যায়, তা প্রমাণ করে, বাঙালির কাছে উমার ঘরে ফেরার আনন্দ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল নয়।
নতুন উদ্দীপনায় কেনাকাটার ভিড় এবং আমেজ জানান দিয়েছে, দুর্গোৎসব বাঙালির ডিএনএ-তে মিশে রয়েছে। এই পরিবর্তনের দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে। মেগা পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে নতুন নিয়ম তৈরি হয়েছে। ক্লাব ও পুজো কমিটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আশঙ্কা বাড়ায় সংস্কৃতি কিছুটা স্বাধীনতা হারাতে পারে। থিমের আতিশয্য কমিয়ে বাংলার মূল পুজো-সংস্কৃতি ও সনাতনী ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিক ক্ষতির ভয় থেকে যাচ্ছে। অনেক বড় বাজেটের কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও থিম-শিল্পীদের আয়ের ক্ষেত্রে সাময়িক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এটা বলা যেতেই পারে, এ বছর বঙ্গের দুর্গাপুজো নিঃসন্দেহে ক্রান্তিকালের সাক্ষী থাকছে। রাজনীতির রং বদল এবং পুজো কমিটির ভোলবদল হলেও, এই উৎসবের মূল নির্যাস কিন্তু একই রয়ে গেছে, 'মিলনোৎসব'। রাজনৈতিক দলগুলো হয়ত ক্ষমতার জোরে পুজো চত্বরের ব্যানার কিংবা সভাপতি বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দুর্গাপুজোর যে শাশ্বত আনন্দ ও আবেগ রয়েছে, তাকে বদলানোর ক্ষমতা কারও নেই। পরিবর্তনের এই হাওয়ায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সময়ের দাবি।





