নিউজ ডেস্ক: ২১ বছর ধরে রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়েছেন। কখনও পরিত্যক্ত বাড়িতে রাত কাটিয়েছেন, কখনও দু’বেলা খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর কাছে ভবিষ্যৎ বলতে ছিল কেবল আরও একটা দিন কোনও ভাবে কাটিয়ে দেওয়া। অথচ সেই মানুষটির নামেই জমছিল বিপুল অর্থ। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল ৪ লক্ষ ২৪ হাজার ২০৪ ইউয়ান, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬১ লক্ষ টাকা। কিন্তু সেই টাকার কথা জানতেনই না তিনি! চিনের হুনান প্রদেশের ৭১ বছরের এক ব্যক্তি, পদবি ‘রু’। প্রায় ২১ বছর ধরে তাঁর জীবন কেটেছে স্ক্র্যাপ বা ফেলে দেওয়া জিনিস সংগ্রহ করে। সেই মানুষটির জীবনেই আচমকা এমন মোড় এসেছে, যা অনেকটা গল্পের মতো।
রুর জীবন অবশ্য একেবারেই স্বচ্ছল ছিল না। অবসর নেওয়ার আগে প্রায় ৩০ বছর হুনানের একটি সরকারি মালিকানাধীন দোকানে কাজ করেছিলেন তিনি। পরে ২০০০-এর দশকের গোড়ায় কর্মী পুনর্গঠনের সময় চাকরি চলে যায়। সেই সময় নিয়ম অনুযায়ী তিনি কিছু ক্ষতিপূরণও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর্থিক সঙ্কট ক্রমশ তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য তাঁকে আবর্জনা ও পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহের কাজ বেছে নিতে হয়। তার পর শুরু হয় তাঁর জীবনের দীর্ঘতম অধ্যায়—একুশ বছর ধরে কুড়িয়ে খাওয়া। চাংশে চলে আসার পরও পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালের শীতকালে সমাজকল্যাণ দফতরের কর্মীদের নজরে আসেন রু। তাঁকে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে থাকতে দেখা যায়। সরকারি কর্মীরা তাঁকে অস্থায়ী আশ্রয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রথমে রাজি হননি তিনি। পরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং নিয়মিত সহায়তার আশ্বাস পেয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে সম্মত হন।
সেখানেই খুলতে শুরু করে তাঁর জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়। রুর কাছ থেকে তাঁর পুরনো কর্মজীবনের তথ্য পাওয়ার পর আধিকারিকেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, অবসর নেওয়ার পর থেকেই তিনি পেনশনের অধিকারী ছিলেন। ২০১৫ সালে তাঁর অবসরের বয়স পূর্ণ হয়েছিল। অথচ এত বছর ধরে তিনি সেই পেনশন পাননি।
কেন? রুর নিজেরই ধারণা ছিল, পেনশন পেতে হলে তাঁকে আলাদা করে দীর্ঘমেয়াদি বিমা বা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে টাকা জমা দিতে হবে। আর আর্থিক অনটনের কারণে সেই টাকা দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে নিজের প্রাপ্য থেকেও তিনি দূরে থেকে গিয়েছিলেন। পরে আধিকারিকেরা তাঁকে বোঝান, তাঁর আগের চাকরির সময় বেতন থেকে সামাজিক বিমার জন্য যে অর্থ কেটে নেওয়া হয়েছিল, সেটিই তাঁর পেনশনের যোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। চিনের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সামাজিক বিমায় অবদান থাকলে অবসরের বয়সে পেনশন পাওয়ার অধিকার তৈরি হয়। রুর ক্ষেত্রেও সেই যোগ্যতা তৈরি হয়েছিল।
আর সেই হিসাব করতেই সামনে আসে বিস্ময়কর অঙ্ক । মাসে তাঁর পেনশন পাওয়ার পরিমাণ আনুমানিক ৩,৭০০ ইউয়ান। ২০১৫ সালে অবসরের যোগ্যতা অর্জনের পর প্রায় এক দশকের বকেয়া অর্থ জমতে জমতে দাঁড়িয়েছে ৪ লক্ষ ২৪ হাজার ২০৪ ইউয়ান। ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৬১ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, যে মানুষটি একুশ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়ে জীবন চালিয়েছেন, তাঁর নিজের নামে এত দিন ধরে জমে ছিল এমন একটি অর্থ, যার কথা তিনি জানতেনই না।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রুর হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই পেনশন অ্যাকাউন্টের ব্যাংক কার্ড। ব্যালান্স দেখার পর আবেগ সামলাতে পারেননি তিনি। এত বছরের অভাব, অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের পরে হঠাৎ সামনে ৪ লক্ষের বেশি ইউয়ানের সঞ্চয়—তাঁর কাছে যেন অবিশ্বাস্য।
রু জানিয়েছেন, তিনি অত্যন্ত খুশি। এমন অর্থ পাওয়ার কথা কোনও দিন ভাবেননি। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে সহায়তা করার জন্য সমাজকল্যাণ দফতর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মীদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। তবে এই গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন টাকা পাওয়া নয়, কী ভাবে একজন মানুষ নিজের প্রাপ্য থেকেও বছরের পর বছর বঞ্চিত থেকে গেলেন?
একসময় সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন দশক কাজ করেছিলেন রু। তাঁর বেতন থেকে নিয়মিত সামাজিক বিমার টাকা কাটা হয়েছিল। কিন্তু অবসরজীবনে সেই অধিকার সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকায় তিনি পেনশনের জন্য আবেদনই করেননি। আর্থিক সঙ্কট তাঁকে শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়, যেখানে নিজের বেঁচে থাকার জন্য তাঁকে পরিত্যক্ত জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করতে হয়েছে।
একুশ বছর পর সেই মানুষটির জীবনে অবশ্য ছবিটা বদলেছে। সমাজকল্যাণ কর্মীরা তাঁকে ব্যাংক কার্ডটি দিয়ে সাবধান করেছেন—কার্ডটি নিরাপদে রাখতে হবে, টাকা ভেবেচিন্তে খরচ করতে হবে এবং টেলিফোন বা অনলাইন প্রতারণার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
বয়স এখন ৭১। জীবনের যে দীর্ঘ সময়টা অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই কেটে গিয়েছে, তা আর ফিরবে না। কিন্তু অন্তত জীবনের শেষ অধ্যায়ে রুর সামনে এসেছে একটু স্বস্তির সুযোগ।
রাস্তায় ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়ে যে মানুষটি বছরের পর বছর সংসার চালিয়েছেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ‘সম্পদ’ যে এত দিন তাঁর অজান্তেই জমছিল, সেটাই হয়তো এই গল্পের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য মোড়। ৬১ লক্ষ টাকা তাঁর কাছে শুধু অর্থ নয়, ২১ বছর পরে নিজের প্রাপ্য ফিরে পাওয়ার এক অপ্রত্যাশিত স্বীকৃতি।
