বিশেষ প্রতিবেদন: কফি বানানোর পর যে উচ্ছিষ্টকে সাধারণত বর্জ্য হিসেবেই দেখা হয়, তা দিয়েই তৈরি হতে পারে নতুন বন! এমনই চমকপ্রদ নজির সামনে এসেছে কোস্টা রিকায়। পরিত্যক্ত একটি চারণভূমিতে প্রায় ৩০ ট্রাক কফি-পাল্প ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। মাত্র দু’বছর পর দেখা গেল, সেই জমির বড় অংশ ঢেকে গিয়েছে গাছপালায়। ঘটনাটি ২০১৮ সালের। দক্ষিণ কোস্টা রিকার একটি পরিত্যক্ত চারণভূমির প্রায় ৩৫ মিটার বাই ৪০ মিটার জায়গায় পরীক্ষাটি চালানো হয়। সেখানে প্রায় ৩৬০ ঘনমিটার কফি-পাল্প ফেলা হয়েছিল। কোথাও কোথাও বর্জ্যের স্তর ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পুরু। পাশাপাশি একই মাপের আর একটি জমি রাখা হয়েছিল পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্র হিসেবে—সেখানে কোনও কফি-বর্জ্য ফেলা হয়নি।
ফল মিলতে শুরু করে খুব দ্রুত। কফি-পাল্পের মোটা স্তর জমির উপর থাকা ঘাসকে কার্যত দমিয়ে দেয়। প্রায় তিন মাসের মধ্যেই বর্জ্যের স্তরের পুরুত্ব প্রায় অর্ধেক হয়ে যায় এবং নীচের ঘাস মরে পচতে শুরু করে। দু’বছর পরে দেখা যায়, কফি-পাল্প দেওয়া জমিতে ঘাস প্রায় উধাও। অথচ পাশের নিয়ন্ত্রণ জমির ৮০ শতাংশেরও বেশি অংশ তখনও ঘাসে ঢাকা। এর পরেই শুরু হয় আসল পরিবর্তন। কফি-পাল্প দেওয়া জমিতে নিজে থেকেই গজিয়ে উঠতে থাকে নানা ধরনের গাছ ও কাঠজাতীয় উদ্ভিদ।
গবেষণার প্রথম বছরের শেষে ওই জমিতে এক সেন্টিমিটারের বেশি মোটা কাঠজাতীয় উদ্ভিদের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ জমির তুলনায় প্রায় ১৬ গুণ বেশি ছিল। দ্বিতীয় বছরের শেষে সেই ব্যবধান বেড়ে হয় ২০ গুণেরও বেশি। শুধু গাছের সংখ্যা নয়, গাছের আকারেও ছিল বড় পার্থক্য। দু’বছর পর কফি-বর্জ্য দেওয়া জমিতে গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ৪.৩ মিটার। অন্য দিকে, বর্জ্য না দেওয়া জমিতে গাছের গড় উচ্চতা ছিল মাত্র প্রায় ১.৪ মিটার। দুই মিটারের বেশি উচ্চতার গাছের ছাউনি কফি-পাল্প দেওয়া জমির প্রায় ৮৩ শতাংশ এলাকা ঢেকে ফেলেছিল।
তবে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। কফির উচ্ছিষ্ট থেকে সরাসরি গাছ তৈরি হয়নি। বরং কফি-পাল্প জমির পরিবেশটাই বদলে দিয়েছিল। পুষ্টিসমৃদ্ধ এই জৈব পদার্থ জমিতে পুরু আস্তরণ তৈরি করে আগাছা ও চারণভূমির ঘাসের বৃদ্ধি আটকে দেয়। ফলে গাছের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বীজগুলি মূলত বাতাস এবং বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে ওই এলাকায় পৌঁছেছিল।
২০২১ সালে প্রকাশিত ‘Coffee pulp accelerates early tropical forest succession on old fields’ গবেষণায় এই পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হয়। গবেষকদের উদ্দেশ্য ছিল, পরিত্যক্ত কৃষিজমিতে প্রাকৃতিক ভাবে জঙ্গল ফিরে আসার পথে যে বাধাগুলি থাকে, কফি-পাল্প সেগুলি কতটা দূর করতে পারে তা দেখা। এর আগে কোস্টা রিকাতেই কৃষি-বর্জ্য ব্যবহার করে জমি পুনরুদ্ধারের আরও একটি পরীক্ষা হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে একটি পরিত্যক্ত গবাদি পশুর চারণভূমিতে প্রায় ১২ হাজার টন কমলালেবুর খোসা ও পাল্প ফেলা হয়েছিল। ১৬ বছর পর সেই জমিতে পাশের নিয়ন্ত্রণ এলাকার তুলনায় কাঠজাতীয় উদ্ভিদের প্রজাতির বৈচিত্র্য প্রায় তিন গুণ বেশি পাওয়া যায় এবং মাটির উপরের কাঠজাতীয় উদ্ভিদের জৈবভরও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি ছিল।
তবে এখানেই সতর্ক করছেন গবেষকেরা। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মাত্র দু’বছরের পরীক্ষার ফল দেখে সর্বত্র কফি-বর্জ্য ছড়িয়ে বন তৈরি করা সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি। বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পরিবহণের জন্য উপযুক্ত রাস্তা ও জমি প্রয়োজন। অতিরিক্ত জৈব পদার্থ বা তার সঙ্গে থাকা কোনও দূষক বৃষ্টির জলের সঙ্গে আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই বড় পরিসরে প্রয়োগের আগে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা প্রয়োজন। অর্থাৎ, কফির উচ্ছিষ্টকে শুধুই বর্জ্য না ভেবে পরিত্যক্ত জমিতে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে দেখার নতুন দরজা খুলেছে কোস্টা রিকার এই পরীক্ষা। কফির কাপের নীচে পড়ে থাকা যে অবশিষ্টাংশকে এত দিন আবর্জনা বলে ফেলে দেওয়া হত, সেটিই হয়তো কোনও কোনও ক্ষেত্রে মরে যাওয়া জমিতে ফের সবুজ ফিরিয়ে আনার কাজে লাগতে পারে।
