দার্জিলিং, নিউজ ডেস্ক: পূজোর আবহে সেজে উঠেছে পাহাড়। চারিদিকে উৎসবের আমেজ থাকলেও দার্জিলিঙের দুর্গোৎসবের ছবিটা সমতলের চেনা ছবি থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এখানে পুজোর জাঁকজমকের পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব পায় ধর্মীয় আচার এবং বহুদিন ধরে চলে আসা পারিবারিক ঐতিহ্য। এখানে মা দুর্গার আরাধনাকে ঘিরে এমন এক রীতি রয়েছে, যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি। আর সেই রীতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিশেষ উপকরণ, যা নেপালি সম্প্রদায়ের কাছে পুজোর অন্যতম প্রধান অঙ্গ।
পুজোর এই বিশেষ উপকরণটির নাম 'জামারা'। গমের বীজ থেকে জন্মানো সবুজ চারাকে ঘিরে নেপালি সম্প্রদায়ের দুর্গা পুজোর বিশেষ আচার পালিত হয়। বাঙালি সম্প্রদায়ের পূজোয় যেমন প্রতিমা দর্শন, পুষ্পাঞ্জলী,ধুনুচি নাচ কিংবা সিঁদুর খেলা বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে, তেমনই নেপালি সম্প্রদায়ের পুজোয় জামারার গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে।
পুজোর প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় জামারা তৈরীর প্রক্রিয়া। যে মন্দির বা মন্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়, সেখানে উপস্থিত হন ভক্তরা। দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে প্রার্থনা ও আরতি করার পর গমের বীজ বপন করা হয়। পুজোর দিনগুলিতে সেই বীজ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় সবুজ চারাগাছ। পুজোর এই বিশেষ আচার নেপালি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরম্পরার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাধারণত পুজোর মন্দির বা মণ্ডপে জামারা রাখা হয়। দশমীর দিন সেই জামারা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বাড়ির বড়রা ছোটদের মাথায় বা কানে জামারা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। এর মধ্য দিয়ে পরিবারের মঙ্গল, সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়। এই প্রথা শুধুমাত্র ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধনকেও আরও দৃঢ় করে। দুর্গাপূজার দশমীর পর থেকেই নেপালি সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় উৎসব 'টিকা' শুরু হয়। প্রায় সাত দিন ধরে চলে এই উৎসব। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বড়দের আশীর্বাদ গ্রহণ এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই উৎসব উৎযাপন করেন তাঁরা।
দার্জিলিং পাহাড়ি এলাকায় থিম প্যান্ডেল বা আলোকসজ্জার থেকে পূজোর ধর্মীয় রীতি ও ঐতিহ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুজো শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু পরিবার নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই সময় পাহাড়ে আমিষ খাবারের বিক্রিও অনেকটা কমে যায়। সব মিলিয়ে দার্জিলিঙের দুর্গোৎসব শুধুমাত্র দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং নেপালি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। জামারার সবুজ চারার মতই এই প্রাচীন রীতি আজও বেঁচে রয়েছে পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রায়। এই প্রাচীন রীতি পাহাড়ের এই দুর্গা পুজোকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
