মহাকাশ অভিযানে নতুন ইতিহাস লিখল ভারত। প্রথমবারের মতো বেসরকারি সংস্থার তৈরি একটি অরবিটাল রকেট সফলভাবে মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করল। স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের তৈরি ‘বিক্রম-১’ রকেট ‘মিশন আগমন’-এর অধীনে শনিবার দুপুর প্রায় ১২টা নাগাদ অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকে গোটা দেশ। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এটি শুধু একটি রকেট উৎক্ষেপণ নয়, বরং ভারতের মহাকাশ খাতে নীতিগত সংস্কারের বাস্তব সাফল্যের প্রতিফলন।
গত কয়েক বছরে মহাকাশ শিল্পে একাধিক সংস্কারের ফলে বেসরকারি সংস্থার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ইন্ডিয়ান স্পেস পলিসি কার্যকর হওয়ার পর উপগ্রহ নির্মাণ, উৎক্ষেপণ পরিষেবা, মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বাণিজ্যিক মহাকাশ পরিষেবার মতো প্রায় পুরো ভ্যালু চেইনই বেসরকারি সংস্থার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর ফলেই দেশে দ্রুত গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী স্পেস স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম।
সংখ্যার নিরিখেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। ২০১৪ সালে ভারতে যেখানে মাত্র একটি স্পেস স্টার্টআপ ছিল, ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪০০-রও বেশি হয়েছে। বর্তমানে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির মূল্য প্রায় ৮.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের তৈরি বিক্রম-১ ভারতের প্রথম বেসরকারিভাবে নির্মিত অরবিটাল রকেট। এটি লো আর্থ অরবিটে সর্বোচ্চ ৩৫০ কেজি পেলোড বহন করতে সক্ষম। সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট কাঠামোয় তৈরি এই রকেটে রয়েছে শক্তিশালী সলিড-ফুয়েল বুস্টার এবং অত্যাধুনিক থ্রিডি-প্রিন্টেড লিকুইড ইঞ্জিন।
‘মিশন আগমন’-এর মাধ্যমে স্কাইরুটের নিজস্ব স্কোপ উপগ্রহের পাশাপাশি জার্মানির DCUBED, ভারতের গ্রহ স্পেশ-এর SOLARAS S3 এবং কস্মোসার্ভ-এর Embrace নামের একটি রোবোটিক আর্ম মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও প্রতীকীভাবে পাঠানো হয়েছে ‘কসমিক ব্লুম’ নামে একটি শিল্পকর্ম এবং ১৮ ক্যারেট সোনার তৈরি একটি ক্ষুদ্র রকেট, যাতে ভারতের তিন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী সি. ভি. রমন, বিক্রম সারাভাই এবং এ. পি. জে. আব্দুল কালাম-এর ক্ষুদ্র ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে।
মহাকাশ শিল্পে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল স্পেস প্রোমোশন অ্যান্ড অথরাইজেশন সেন্টার। বর্তমানে এই সংস্থাই বেসরকারি মহাকাশ প্রকল্পের অনুমোদন, ইসরোর প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ইন-স্পেসের কাছে ৪,৫০০-রও বেশি সংস্থা নথিভুক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যেই ১৩৩টি অনুমোদন এবং ১০৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতীয় স্পেস স্টার্টআপগুলিতে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগেও সহায়তা করেছে সংস্থাটি।
স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ দিতে চালু করা হয়েছে IN-SPACe Seed Fund Scheme, যার মাধ্যমে যোগ্য সংস্থাগুলিকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে ১,০০০ কোটি টাকার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড এবং ৫০০ কোটি টাকার টেকনোলজি অ্যাডপশন ফান্ড, যার লক্ষ্য মহাকাশ প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতেও মহাকাশ খাতে এফডিআই নীতি শিথিল করেছে কেন্দ্র। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্যাটেলাইট উৎপাদন ও পরিচালনায় ৭৪ শতাংশ, স্পেসপোর্টে ৪৯ শতাংশ এবং স্যাটেলাইটের যন্ত্রাংশ ও সাব-সিস্টেম তৈরিতে ১০০ শতাংশ অটোমেটিক এফডিআই অনুমোদন করা হয়েছে।