হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বাংলাদেশের খুলনায় আবারও প্রকাশ্য দিবালোকে গান ফায়ার। আবারও খুন। যেন খুনের রাজ্যে মগের মুল্লুকে বসবাস। খুলনাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান এবং মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ ঘোষণা' করা সত্ত্বেও যেন থামছে না আতঙ্ক। থামছে না হত্যাযজ্ঞ্য। একের পর এক হত্যাকা-, গুলিবর্ষণ, অপহরণের অভিযোগ, গণপিটুনিতে মৃত্যু এবং মাদক কারবারের খবরে নগরবাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার পরও অপরাধীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে অভিযানের পরও নগরীর অপরাধজগতের শিকড় কতটা গভীরে?
এদিকে, গত শনিবার খুলনার দৌলতপুরে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে মোঃ জলিল মুন্সি নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দৌলতপুর থানার কুলিবাগান বটতলার অদূরে একটি অফিসের সামনে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। জলিল সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার সাধু বাগানের দিলু মুন্সির ছেলে। তিনি পেশায় একজন পাট শ্রমিক ছিলেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, বেপরোয়া গ্যাং কালচার ও একের পর এক নৃশংস খুনের ঘটনায় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদরদপ্তর। বিভাগীয় নগরী খুলনায় দিনদুপুরে খুনখারাবি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি রুখতে এবং অপরাধ দমনে কাক্সিক্ষত ফল দেখাতে খুলনার শীর্ষ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে ৩০ দিনের কঠোর সময়সীমা (আল্টিমেটাম) বেঁধে দেওয়া হয়েছে। খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান এবং পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার ওমর ফারুককে এই কড়া বার্তা দেওয়া হয়। এরপরও থামছে না হত্যাযজ্ঞ্য। একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটেই চলেছে।
খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মহানগরে অন্তত প্রায় ২৮টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগেরই মূল কারণ মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযান ও গ্রেফতারের পরও অভিযুক্তদের কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যেই কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। খুলনা নগরবাসীর প্রশ্ন, অপরাধীদের দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হলেও জামিনের পর তারা যাতে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি রয়েছে কি না।
গত বুধবার খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গার নিরালা এলাকার তালুকদার কমিউনিটি সেন্টারের পাশে মুস্তাকিন (২৮) নামে এক তরুণ ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে চারটি মোটরসাইকেলে আসা আটজন হামলাকারী প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। গত আগস্ট মাসে লবণচরা থানার আশীবিঘা এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে মঞ্জুরুল ও নাজমুল নামের দুই যুবককে গুলি করে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কয়েক মাস আগে খুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ যৌথ অভিযান চলাকালীন দিন দুপুরেই রফিকুল ইসলাম নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা করে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অধিকাংশ খুনের ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক চোরাচালান ও স্থানীয় গ্যাংগুলোর এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। এছাড়া পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে অনেক সন্ত্রাসী ও খুনের মামলার আসামি গ্রেপ্তার হলেও, তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে এবং বিভিন্ন উপায়ে অপরাধীদের হাতে অবৈধ ও লুণ্ঠিত আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র চলে এসেছে। আর সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থার সংকটের কারণে পুলিশকে তথ্য বা ক্লু দিতে ভয় পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক খুনের ঘটনার পর খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও র্যাব-৬ যৌথভাবে মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অভিযান শুরু করেছে। সোনাডাঙ্গার জোড়া খুনের ঘটনায় শীর্ষ অপরাধী আলামিন হাসান সাইফিসহ বেশ কয়েকজন আসামিকে ইতিমধ্যেই আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া খুলনা মহানগর পুলিশ ও র্যাব-৬ জেলাজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে এবং প্রতিনিয়ত অপরাধীদের আস্তানায় হানা দিচ্ছে। সম্প্রতি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নগরীর ৮টি থানার ওসিদেরও একযোগে বদলি করা হয়েছিল। খুলনা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে খুলনাকে সন্ত্রাস কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা এবং অপরাধ দমনে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
র্যাব-৬-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে ৬৩৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে ৩৫ জন ভিকটিম উদ্ধার, ৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৯৫ রাউন্ড গুলি, ১৩টি ম্যাগাজিন এবং ৮৪টি বোমা ও ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ৯৫৬ বোতল ফেনসিডিল, ৪২ হাজার ১৯টি ইয়াবা, ৩২৩ দশমিক ২ কেজি গাঁজা, ২৩৮ দশমিক ৮৪ লিটার দেশি মদ, ১ হাজার ২৩৯ বোতল ফায়াড্রিল, ১ দশমিক ৫১ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ৬ হাজার ৯৯৫ বোতল ইসকাফ সিরাপ, ২২ হাজার ৮২৪টি ট্যাপেন্টাডল, ১৫ হাজার ২৯৮ বোতল উইনকরিক্স ও ৯৬ হাজার পিস পাতার বিড়ি।
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাড. বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘খুলনা শহরে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবিলম্বে খুলনাকে সন্ত্রাস কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের তালিকা করে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা গেলে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
কেএমপি কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, যোগদানের দিন থেকেই অভিযানের ধরন ও কৌশল পরিবর্তন করা হয়েছে। বাড়ানো হচ্ছে গোয়েন্দা নজরদারি। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। গত এক মাসে নগরী থেকে সাতটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি জানান, ২৬ আগস্ট টুটপাড়ায় মামুন মীরকে গুলি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দারোগাপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও বিপুল পরিমাণ দেশি অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের দাবি, গত এক মাসে নগরীতে খুনের ঘটনা অনেক কমেছে এবং মাদক কারবারিদের আনাগোনাও কমেছে। সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও মাদক নির্মূলে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডেই নানামুখী অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।