কাঠমান্ডু, নিউজ ডেস্ক: আকাশে মেঘ নেই, বৃষ্টিরও তেমন চিহ্ন ছিল না। অথচ আচমকাই পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এল বিপুল জলের তোড়। চোখের সামনে ফুলেফেঁপে উঠল ভুটে কোশি নদী। তার পরেই কাদা, পাথর আর ধ্বংসাবশেষ মেশানো জলরাশি ছুটে গেল জনবসতির দিকে। ভেসে গেল বাড়ি, রাস্তা, সেতু, গাড়ি, বাজার এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একাধিক পরিকাঠামো। তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া নেপালের রসুয়া জেলায় বুধবারের এই ভয়াবহ হড়পা বানে এখনও পর্যন্ত অন্তত ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। বহু মানুষ নিখোঁজ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের।
বিপর্যয়ের কেন্দ্র রসুয়া জেলার তিমুরে এবং স্যাফ্রুবেশি এলাকা। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে এই পাহাড়ি অঞ্চলেই আচমকা ভুটে কোশি নদীর জলস্তর অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। নদীটি তিব্বতের দিক থেকে নেপালে প্রবেশ করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য, বন্যার জল এত দ্রুত এবং এত শক্তিশালী ভাবে নেমে আসে যে বহু মানুষকে নিজেদের সামলানোর সময়টুকুও দেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রসুয়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারী দলগুলির পক্ষেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এবং আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার পাঠানো হলেও তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশির উপর জলের উচ্চতা এতটাই বেশি ছিল যে সেখানে সহজে হেলিকপ্টার নামানো সম্ভব হয়নি। ফলে আকাশপথে উদ্ধার অভিযানও বাধার মুখে পড়েছে।
নিখোঁজের সংখ্যা নিয়েই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
প্রাণহানির পাশাপাশি নিখোঁজের সংখ্যাই এখন নেপাল প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর বহু কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। স্থানীয় রিপোর্টে বলা হয়েছে, নেপাল পুলিশের ২৬ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সাত জন কর্মী এখনও নিখোঁজ। তিমুরে সীমান্ত শুল্ক দফতরের ১৪ জন কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে খবর। ফলে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। নেপাল সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় আটকে পড়া পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদেরও খোঁজ চলছে। এনডিটিভির সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় রয়েছেন বলে খবর। মোট ৩৮৪ জন পর্যটকের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে বলে নিখোঁজের সংখ্যাও ওঠানামা করছে।
কয়েক মিনিটেই বদলে গেল সব
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, ঘটনাটি কার্যত আচমকা। নদীর জল প্রথমে দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তার পরেই প্রবল স্রোতে নদীর দু’পাশের এলাকা প্লাবিত হতে থাকে। গাড়ি, পণ্যসামগ্রী এবং রাস্তার ধারে থাকা বিভিন্ন পরিকাঠামো জলের তোড়ে ভেসে যায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলিতেও দেখা গিয়েছে, কাদামাটি মেশানো কালচে জলের বিশাল স্রোত কী ভাবে জনবসতির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিক নরেন্দ্র পারিয়ার জানিয়েছেন, বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনও সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চলছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জেলা সদর এলাকায় ওই সময় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিও হয়নি বলে প্রশাসন জানিয়েছে। ফলে এত অল্প সময়ে ভুটে কোশির জলস্তর এমন ভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনও বিপর্যস্ত
প্রকৃতির রোষে শুধু মানুষ এবং বসতি নয়, বড় ধাক্কা খেয়েছে নেপালের পরিকাঠামোও। রাস্তা ও সেতুর পাশাপাশি একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের শক্তি মন্ত্রকের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এই বিপর্যয়ের জেরে ব্যাহত হয়েছে।
অর্থাৎ একটি পাহাড়ি জেলার বন্যা দেশের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর উপরও বড় প্রভাব ফেলেছে। তিমুরে এলাকার পুলিশ অফিস, স্যাফ্রুবেশির পুলিশ পোস্ট এবং রাসুওয়াগঢ়ী সীমান্তের পুলিশ পোস্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। সীমান্ত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তিব্বতেও বিপর্যয়, বন্ধ যোগাযোগ
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতেও বিপর্যয়ের খবর এসেছে। সেখানে ধসের জেরে নেপাল-চিন সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে। চিনের তরফে ওই এলাকায় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে এবং কয়েক জন নিখোঁজ থাকার খবরও মিলেছে। ফলে এটি শুধুমাত্র নেপালের অভ্যন্তরীণ বন্যা নয়, হিমালয়ের দুই প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া একটি আন্তঃসীমান্ত বিপর্যয়ের চেহারা নিয়েছে।
কেন এত আচমকা জল?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত ভাবে মেলেনি। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, হঠাৎ জলের প্রবল স্রোত নেমে এসেছিল, কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। মেঘভাঙা বৃষ্টি, পাহাড়ি এলাকায় জল জমে থাকা, হিমবাহ-সংক্রান্ত ঘটনা কিংবা হিমবাহের কাছাকাছি কোনও জলাধার আচমকা ভেঙে পড়ার মতো একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সরকারি ভাবে এখনও কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করা হয়নি।
গত বছরও এই ভুটে কোশি নদী ভয়াবহ বন্যার সাক্ষী হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওই নদীর বন্যায় নেপাল-চিন সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যায় এবং প্রাণহানিও হয়েছিল। পরে সেই বিপর্যয়ের সঙ্গে তিব্বতের একটি হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদের জল আচমকা নেমে আসার যোগ পাওয়া যায়। এবারের ঘটনার সঙ্গে একই কারণের যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
নীচের দিকেও সতর্কতা
ভুটে কোশির জল নেমে গিয়ে মিশে যায় ত্রিশূলী নদীতে। ফলে রসুয়ায় বিপর্যয় থেমে থাকেনি। ত্রিশূলী নদীর জলস্তর বাড়ার আশঙ্কায় নীচের দিকের একাধিক জেলায় সতর্কতা জারি হয়েছে। রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা এবং চিতওয়ানের নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নদীতে মাছ ধরা বা অন্য কাজে যাঁরা ছিলেন, তাঁদেরও দ্রুত সরে যেতে বলা হয়েছে। এই নদী-ব্যবস্থার আরও বিস্তৃত তাৎপর্য রয়েছে। ত্রিশূলী শেষ পর্যন্ত গণ্ডক নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতের দিকেও প্রবাহিত হয়। তাই হিমালয়ের এই আকস্মিক বন্যার জলধারার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে নীচের অববাহিকাতেও পৌঁছতে পারে।
উদ্ধার অভিযানে সময়ের সঙ্গে লড়াই
নেপাল সরকার সেনা, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে উদ্ধার কাজে নামিয়েছে। একাধিক হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিন্তু নদীর প্রবল স্রোত, ধসে যাওয়া রাস্তা, বিচ্ছিন্ন সেতু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপেই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, এখনও বহু প্রত্যন্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে পারেনি। ফলে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর কিংবা বিচ্ছিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
হিমালয়ের কোলে বার বার এমন আকস্মিক বিপর্যয় এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—উষ্ণায়ন, হিমবাহের পরিবর্তন এবং পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত পরিকাঠামো নির্মাণের যুগে এই ধরনের হড়পা বান মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত? বুধবার রসুয়ায় কয়েক মিনিটের জলের তোড় যে ছবি রেখে গেল, তা শুধু একটি জেলার বিপর্যয়ের ছবি নয়। হিমালয়ের বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সামনে মানুষের অসহায়তারও এক ভয়াবহ ছবি।