নয়াদিল্লি: দেশে কোনও বড় আন্দোলন মাথা তুললেই কি শাসকের মুখে ফিরে আসে ‘বিদেশি হাত’-এর তত্ত্ব? দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হোক, ছাত্র আন্দোলন কিংবা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিক্ষোভ—আন্দোলনকারীদের দাবির জবাব দেওয়ার বদলে তাঁদের পিছনে বিদেশি শক্তির মদত রয়েছে বলে অভিযোগ তোলার প্রবণতা কি ভারতীয় রাজনীতিতে বারবার ফিরে এসেছে? দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র বিক্ষোভ ঘিরে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তরজার প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নই সামনে এনেছে অতীতের একাধিক আন্দোলনের ইতিহাস।
জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে আন্দোলন থেকে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন, আবার সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে প্রতিবাদ—বিভিন্ন সময়ের এই ঘটনাগুলিকে পাশাপাশি রেখে দেখলে একটি রাজনৈতিক প্রবণতার দিকে নজর পড়ে। শাসক পক্ষের একাংশ আন্দোলনকে কখনও দেশের স্থিতিশীলতার পক্ষে বিপজ্জনক, কখনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্য দিকে, আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে সংবিধান, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের স্বাধীনতার কথা বলেছেন।
‘বিদেশি হাত’-এর পুরনো রাজনীতি
সত্তরের দশকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ বাড়ছিল। মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভের আবহে ছাত্র আন্দোলন ক্রমশ বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের চেহারা নেয়। বিহারে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় গুরুত্ব পায়। জেপি-র আহ্বানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি আরও জোরালো হয়।
এই আন্দোলন ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। ১৯৭৫ সালের জুনে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। বিরোধী নেতা, আন্দোলনকারী এবং সংবাদমাধ্যমের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেই সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের পিছনে বিদেশি প্রভাব রয়েছে, এমন অভিযোগও রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে এসেছিল। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় সেই পর্বের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।
পরবর্তী সময়েও ইন্দিরা গান্ধী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তির প্রভাবের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। মরাদাবাদের দাঙ্গা থেকে অসম আন্দোলন—বিভিন্ন ঘটনাকে ঘিরে তাঁর বক্তব্যে বাইরের শক্তির ভূমিকার অভিযোগ উঠে আসে। ফলে ‘বিদেশি হাত’ শুধু কোনও একটি আন্দোলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া তত্ত্ব ছিল না; রাজনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা দিতে বিভিন্ন সময়ে এই ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে।
আন্না হাজারের আন্দোলনেও উঠেছিল বিদেশি মদতের অভিযোগ
২০১১ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। লোকপাল গঠনের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে তাঁর অনশন এবং দেশজুড়ে সমর্থন তৎকালীন মনমোহন সিং সরকারের উপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ, তরুণ এবং নাগরিক সমাজের একাংশ অংশ নেন।
সেই আন্দোলনকে ঘিরেও বিদেশি মদত এবং বাইরের শক্তির প্রভাবের অভিযোগ সামনে এসেছিল। তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যে আন্দোলনের পিছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অন্য দিকে, আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই প্রতিবাদের জন্ম। ফলে আন্দোলনের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি তার পিছনে কারা রয়েছেন, তা নিয়েও সংঘাত তৈরি হয়েছিল।
জেপি আন্দোলন এবং আন্না হাজারের আন্দোলনের সময়কাল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দাবিদাওয়া এক ছিল না। তবু দুই ক্ষেত্রেই শাসক পক্ষের একাংশের বক্তব্যে বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ এবং আন্দোলনকারীদের তরফে জনসমর্থনের দাবি—এই দুই প্রবণতার মিল লক্ষ করা যায়।
মোদী জমানায় কৃষক আন্দোলন থেকে সিজেপি
নরেন্দ্র মোদীর আমলেও একাধিক বড় আন্দোলন ঘিরে বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময় আন্তর্জাতিক মহলের কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন প্রতিবাদকারীদের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। পপ তারকা রিহানা এবং পরিবেশকর্মী গ্রেটা টুনবার্গের মতো ব্যক্তিত্বের মন্তব্যের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। সেই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের তরফে ‘ফরেন ডেস্ট্রাকটিভ আইডিয়োলজি’ বা বিদেশি ধ্বংসাত্মক মতাদর্শের প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে সিজেপি-র আন্দোলন ঘিরেও একই ধরনের বিতর্ক সামনে এসেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে দিল্লিতে জমায়েতের চেষ্টা করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি। বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশি বাধা, আটক এবং বিরোধী দলগুলির সমর্থন রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরীওয়াল এবং সিজেপি-র সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বিদেশি শক্তির মদতে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। বিরোধী পক্ষের আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আক্রমণও করেছে বিজেপি।
এই অভিযোগের পাল্টা যুক্তি হল, ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। আন্দোলনের দাবিগুলি কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা বিচার করতে হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখা দরকার। আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির প্রতিনিধি বলে চিহ্নিত করলেই তাঁদের উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়ে যায় না।
আন্দোলনের অধিকার বনাম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা
গণতন্ত্রে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা নাগরিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। কোনও আন্দোলনে বিদেশি অর্থ বা নির্দেশের যোগসূত্রের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত হতে পারে, প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু প্রমাণ ছাড়া গোটা আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে দাগিয়ে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্ষোভ ও দাবিগুলি আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জেপি আন্দোলন, আন্না হজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি আন্দোলনের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, দাবি এবং পরিণতি আছে। তাই সব ঘটনাকে এক সূত্রে বাঁধা যেমন ঠিক নয়, তেমনই বারবার ফিরে আসা ‘বিদেশি হাত’-এর অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্যও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে আন্দোলন করছে বা কারা তার সমর্থনে এগিয়ে আসছে, তা নয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগের ভিত্তি কী, সরকারের বক্তব্যের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে এবং প্রশাসন সেই অভিযোগগুলির জবাব কতটা স্বচ্ছ ভাবে দিচ্ছে—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ সত্য হলে তার প্রমাণ সামনে আসা দরকার। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে, সেই তকমা দিয়ে নাগরিক প্রতিবাদকে খারিজ করার প্রবণতাও গণতান্ত্রিক পরিসরে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে।




