নিউজ ডেস্ক: এক দিকে অশান্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্য দিকে কয়েক দশকের সর্বোচ্চ স্তরে উঠে যাওয়া মার্কিন বন্ডের ফলন—সব মিলিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিশ্ব বাজারে চাপ বাড়ছিল। সেই আবহেই মঙ্গলবার কিছুটা স্বস্তির ছবি। তেলের দাম নামল, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দীর্ঘমেয়াদি ফলনও সামান্য নীচে নামল। তার জেরে চাঙ্গা হয়ে উঠল বিশ্বের একাধিক শেয়ার বাজার। ইউরোপ থেকে এশিয়া, ওয়াল স্ট্রিটের ফিউচার্স—সব জায়গাতেই দেখা গেল ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা।
সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছে অপরিশোধিত তেলের বাজার থেকে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মঙ্গলবার প্রায় 2 শতাংশ কমে ব্যারেল-পিছু 98-এর কাছাকাছি নেমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে 100 পেরিয়ে যাওয়া তেলের দাম ফের নীচে নামায় বিনিয়োগকারীদের একাংশের মনে হয়েছে, মূল্যবৃদ্ধির চাপ হয়তো কিছুটা কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ তুলনামূলক ভাবে স্বাভাবিক থাকা এবং G7-এর জরুরি মজুত বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তও সরবরাহ-সংক্রান্ত উদ্বেগ কমিয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ার বাজারে। ইউরোপের STOXX 600 মঙ্গলবার প্রায় 0.6 শতাংশ উঠেছে। ব্রিটেনের FTSE 100, জার্মানির DAX এবং ফ্রান্সের CAC 40—তিন সূচকই ঊর্ধ্বমুখী। এশিয়াতেও জাপানের Nikkei 225 1 শতাংশের বেশি বেড়েছে। ভারতের Sensex-ও প্রায় 0.7 শতাংশ উত্থান দেখেছে।
ওয়াল স্ট্রিটেও আশাবাদী ছবি। সোমবার Nasdaq নতুন রেকর্ড উচ্চতায় বন্ধ হয়েছিল। মঙ্গলবার S&P 500-ও ফের সর্বকালীন উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তেলের দাম কমার পাশাপাশি মার্কিন বন্ডের ফলন সামান্য কমে আসায় শেয়ার বাজারের উপর সুদের হারের চাপ কিছুটা কমেছে।
তবে বাজারের এই উত্থানের নেপথ্যে শুধু তেলের দাম নয়। আরও বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে কর্পোরেট আয়ের প্রত্যাশা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-কে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উন্মাদনা। আগামী সপ্তাহ থেকেই মার্কিন সংস্থাগুলির ত্রৈমাসিক ফল প্রকাশের মরসুম শুরু হচ্ছে। বাজারের অনুমান, AI-নির্ভর ব্যবসার জোরে S&P 500-এর সংস্থাগুলির মুনাফায় শক্তিশালী বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। ফলে উচ্চ সুদের হার সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের একাংশ শেয়ার বাজার থেকে সরে যাওয়ার বদলে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে অর্থ ঢালছেন।
এখানেই রয়েছে বাজারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। এক দিকে শেয়ার সূচক প্রায় রেকর্ড উচ্চতায়, অন্য দিকে মার্কিন সরকারি ঋণের বাজারে উদ্বেগ এখনও কাটেনি। সোমবার মার্কিন 10 বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন প্রায় 5.35 শতাংশে উঠে 2002 সালের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। 30 বছরের বন্ডের ফলনও 5.70 শতাংশের কাছাকাছি উঠেছিল। মঙ্গলবার অবশ্য দুই ক্ষেত্রেই কিছুটা পতন হয়েছে। 10 বছরের ফলন নেমে এসেছে প্রায় 5.26 শতাংশে।
বন্ডের ফলন এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ সরকারি ঋণের সুদ বাড়লে সংস্থাগুলির ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের আয়কে বর্তমান মূল্যে হিসাব করলে তার মূল্য কমে যায়। ফলে তাত্ত্বিক ভাবে উচ্চ বন্ড ফলন শেয়ার বাজারের জন্য চাপ তৈরি করার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত AI-নির্ভর সংস্থাগুলির শক্তিশালী আয় এবং ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির প্রত্যাশা সেই চাপকে অনেকটাই সামলে দিচ্ছে।
আর রয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা। গত সপ্তাহের তুলনায় দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থানের তথ্য বাজারে এই আশা বাড়িয়েছে যে চলতি মাসে ফেড হয়তো আর সুদ বাড়াবে না। ফলে বন্ডের ফলন সামান্য নীচে নামতেই শেয়ার বাজারে নতুন করে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
তবে স্বস্তি পুরোপুরি ফিরেছে, এমনটা বলার জায়গা এখনও নেই। তেলের দাম ফের বাড়লে মূল্যবৃদ্ধির চাপ ফিরে আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ফলনও যদি আবার দ্রুত বাড়ে, তা হলে শেয়ার বাজারে বড় ধাক্কা আসার আশঙ্কা থাকবে। তার উপর বাজারের উত্থান এখন অনেকটাই হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও AI সংস্থার উপর নির্ভরশীল। বাজারের বিস্তার বা ‘breadth’ কম থাকায় এই উত্থান কতটা টেকসই, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থাৎ, আপাতত সমীকরণটি বেশ পরিষ্কার, তেলের দাম কমছে, বন্ডের ফলন সামান্য নরম হচ্ছে, AI-নির্ভর সংস্থাগুলির আয়ের প্রত্যাশা বাড়ছে—এই তিনের জোরেই বিশ্ব বাজারে ফের ঝুঁকি নেওয়ার হাওয়া। কিন্তু তেলের দাম বা বন্ডের ফলন ফের উল্টো পথে হাঁটলে সেই স্বস্তি কতটা টিকবে, সেটিই এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
